বিষয়বস্তুতে যান

রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাওয়াত

মুহাম্মদ হাসান ইলিয়াস বাংলা

নবীদের শিক্ষা ও দীক্ষার ক্ষেত্র তাদের নিজ নিজ জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তাদের হেদায়েত সময় ও স্থান অনুযায়ী নির্দিষ্ট ছিল। এই দাবি বর্তমান যুগের কিছু মানুষের পক্ষ থেকে উঠেছে। তাদের মতে, সকল নবী তাদের নিজ নিজ জাতির মধ্যে প্রেরিত হয়েছিলেন এবং তাদের শিক্ষা-দীক্ষা শুধুমাত্র ঐ জাতির প্রেক্ষাপটে ছিল।

অতএব, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও আরব জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন এবং তার দাওয়াতও আরবদের পরিবেশ-পরিস্থিতি, ভাষা ও সংস্কৃতির পটভূমির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। সুতরাং, এই দাওয়াত কেবল আরবদের জন্যই নির্দিষ্ট। উপরন্তু, কুরআন মাজিদ তার বক্তব্যে এই দাওয়াতকে শুধুমাত্র আরবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে এবং তার প্রথম শ্রোতাদের উপর এই দায়িত্ব আরোপ করে না যে, তারা এটা পুরো পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।

এর বিপরীতে মুসলিমদের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রেরণ সমগ্র মানবজাতির জন্য ছিল এবং কুরআন মাজিদের বার্তা সামগ্রিক, যা সকল যুগ এবং সকল জাতির জন্য প্রযোজ্য। এই নিবন্ধে আমরা কুরআনের আলোকে এই দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করব।

কুরআন মাজিদের ভাষ্যমতে, নবীরা যে হেদায়েত নিয়ে আসেন, তার মর্মবাণী সবসময় একই, তার বার্তা বিশ্বজনীন ও প্রভাব সামগ্রিক। কোনো নবী নতুন কোনো দাওয়াত নিয়ে আসেন না। আল্লাহতায়ালা বলেছেন:

شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ۚ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ ۚ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ

“তিনি তোমাদের জন্য ঐ দ্বীনই নির্ধারিত করেছেন, যার নির্দেশনা তিনি নুহকে দিয়েছিলেন এবং যা আমি আপনার কাছে ওহি করেছি। আর যার নির্দেশনা আমি ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসাকেও দিয়েছিলাম এই বলে যে, তোমরা (নিজেদের জীবনে) এই দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখো এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি করো না। যে বিষয়ের প্রতি আপনি এই মুশরিকদের আহ্বান করছেন (যেন তারা এক আল্লাহকে মানে) তা এই মুশরিকদের কাছে অনেক কঠিন লাগছে। আল্লাহ যাকে চান, তাঁর দিকে আসার জন্য বেছে নেন, কিন্তু তাঁর দিকে আসার এই পথ তিনি শুধু তাদেরকেই দেখান, যারা তাঁর অভিমুখী হয়।” (সুরা শুরা, ৪২:১৩)

এখান থেকে পরিষ্কার যে, সকল নবী মৌলিকভাবে এক দ্বীনেরই দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন। তবে, এই হেদায়েতের প্রস্তাবনা শ্রোতাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে। কারণ, যে জাতির মধ্যে নবী প্রেরিত হন, সেই জাতির ইতিহাস, ভাষা, চরিত্র ও আচার-আচরণ ভিন্ন হতে পারে। তেমনি তাদের বিচ্যুতির ধরনও ভিন্ন হতে পারে। তবে নবীর দাওয়াতের বিষয়বস্তু, এই বিশেষ প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও, তার মৌলিকতা ও তাৎপর্যে সমস্ত মানবজাতির জন্য জ্ঞান ও হেদায়েতের মশাল হয়।

বিষয়টি এভাবে বোঝা যেতে পারে যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাওহিদের বৈশ্বিক কেন্দ্রকে শিরকের মলিনতা থেকে পবিত্র করেছেন। এই বিচ্যুতির প্রশ্রয়দাতা নিঃসন্দেহে কুরাইশরা ছিল, যারা ঐতিহাসিকভাবে হারামের পুরোহিত ছিল। আরব জাতির একটি ভাষা, সংস্কৃতি ও শিরকের নির্দিষ্ট আচার-আচরণ ছিল। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার জাতিকে তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সম্বোধন করেছেন এবং তাদের মিথ্যা বিশ্বাস ও মতবাদগুলোর বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তবে, যে বার্তা তিনি তাদেরকে দিয়েছেন, তা হলো: এই মূর্তিগুলিকে আল্লাহর অংশীদার বানানো একটি ভ্রষ্টতা ও অপরাধ। নবীর এই দাবি নিঃসন্দেহে সামগ্রিক একটি সত্য, যা কেবল আরবদের সাথে সম্পর্কিত ছিল না।

অতএব, নবীদের শিক্ষা ও দাওয়াতের বিষয়বস্তু মৌলিকভাবে কখনোই স্থান বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নবীগণ তাদের নিজ সত্তায় সর্বজনীন বার্তা, বৈশ্বিক সত্য ও সমস্ত মানবজাতির জন্য হেদায়েতের উৎস।

নবী যখন এই হেদায়েত নিয়ে জাতির মধ্যে প্রেরিত হন, তখন তিনি প্রথমে মানুষের সহজাত প্রকৃতিতে বিদ্যমান সেই ঐশী সচেতনতা উদ্দীপিত করেন, যা প্রতিটি মানুষকে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে। তবে, কিছু ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি আসে, যেখানে মানুষের প্রকৃতিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয় অথবা বিস্তারিত ও বাস্তব প্রয়োগে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে নবী শরিয়ত এবং আইন দিয়ে মানুষের পথপ্রদর্শন করেন। এই আইন তিন ধরনের আদেশে বিভক্ত:

এক. কারণনির্ভর বিধানাবলি, অর্থাৎ যেগুলি কোনো কারণের উপর ভিত্তি করে দেয়া হয়। যখন সেই কারণ থাকবে, তখন আদেশ কার্যকর হবে, আর কারণ অনুপস্থিত থাকলে আদেশের প্রয়োগ হবে না। যেমন, শরিয়তে উত্তরাধিকার-সম্পদের মধ্যে কন্যাদের তুলনায় পুত্রদের দ্বিগুণ অংশ দেয়ার আদেশ রয়েছে। এর কারণ হলো, তাদের সামাজিক ও কর্মগত উপকারিতার মধ্যে পার্থক্য। সুতরাং, যতদিন এই কারণ বজায় থাকবে, ততদিন এই আইন কার্যকর থাকবে। তেমনি, মহিলাদের তালাকবর্তী ইদ্দত পালনের কারণ হলো: গর্ভে সন্তান আছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া। আবার কিছু আদেশ আছে, যেগুলো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেয়া হয়। যেমন, লেনদেনের ক্ষেত্রে এক পুরুষ এবং দুই মহিলাকে সাক্ষী রাখা। এই আদেশের উদ্দেশ্য হলো: সম্ভাব্য বিবাদ থেকে বেঁচে থাকা। অতএব, বিবাদের সম্ভাবনা দূর করার জন্য বিকল্প কোনো পন্থা অবলম্বন করলেও শয়িয়তের উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে।

দুই. যে বিধানগুলো আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে এবং যেগুলো আল্লাহর নির্বাচনের উপর নির্ভরশীল। যেমন, নামাজ, রোজা, হজ্জ ইত্যাদি। অর্থাৎ আল্লাহর আনুগত্য, উপাসনা এবং নজরানা পেশ করার জন্য কোন পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে। যেহেতু এটা আল্লাহর দাবি, তাই তিনি তাঁর পছন্দসই পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন। যদি মানুষের এই নিয়মগুলি পালন করতে কোনো অসুবিধা হয়, তবে আল্লাহ নিজেই এই নিয়মগুলির মধ্যে শিথিলতার বিধান দিয়েছেন।

তিন. যে বিধানগুলো কোনো কোনো রাসুলের জাতিকে বিশেষ মিশনের জন্য নির্বাচনের সাথে সম্পর্কিত। যেমন, বনি ইসরাইল এবং বনি ইসমাইল। এই জাতিগুলিকে তাদের বিশেষ মিশনের জন্য কিছু নির্দিষ্ট বিধান দেয়া হয়েছিল। যেমন, রাসুলের হুজ্জাত বা চূড়ান্ত প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করার পর যারা তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি, তাদের উপর শাস্তি প্রয়োগ। এই বিধানগুলি সেই জাতিগুলিকে একটি বিশেষ মর্যাদা এবং নির্দিষ্ট মিশনের দাবি পূরণের জন্য দেয়া হয়েছিল। এই ধরনের ধর্মীয় আইনগুলি কুরআন নিজেই বিস্তারিত বর্ণনা করেছে এবং সেগুলোর নির্দিষ্ট হওয়ার কারণও বর্ণনা করেছে। এই জাতিগুলির বাইরে অন্য কেউ এই আইনগুলির আওতায় পড়ে না, সুতরাং তারা এগুলো পালনের জন্য বাধ্যও নয়।

নবীগণ যে হেদায়েত নিয়ে আসেন, এই হলো তার বিস্তারিত বিবরণ। এখন আমরা এই প্রশ্নে আসি যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে হেদায়েত নিয়ে এসেছিলেন, তার দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ তাকে এবং তার জাতিকে কী ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিল?

রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যখন আল্লাহতায়ালা বনি ইসমাইলের দিকে প্রেরিত করেন, তখন প্রথমেই যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল, তা হলো:

وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ

“আপনার গোত্রের লোকদের সতর্ক করুন।” (সুরা শুয়ারা, ২৬:২১৪)

এখানে এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর গোত্রের লোকেরাই বাইতুল্লাহর তত্ত্বাবধয়াক ছিল। এই বিষয়টি আল্লাহতায়ালা অন্য একটি স্থানে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন:

هَٰذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ مُّصَدِّقُ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَلِتُنذِرَ أُمَّ الْقُرَىٰ وَمَنْ حَوْلَهَا

“এটা এমনই একটি কিতাব, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, বড়ই বরকতময় এবং এর পূর্বে যা কিছু এসেছিল তাকে সত্যে পরিণত করে, যাতে এর দ্বারা আপনি মানুষকে সুসংবাদ জানাতে পারেন এবং কেন্দ্রীয় জনপদ ও এর চতুর্পার্শ্বে বসবাসকারী লোকদেরকে এর দ্বারা হুঁশিয়ার করতে পারেন।” (সুরা আনআম, ৬:৯২)

অতএব, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মূল শ্রোতাগণ বনি ইসমাইল ছিল এবং তাকে তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তিনি তাঁদের জন্য আদালত হিসেবে এসেছিলেন, তবে যে বার্তা কুরআন মাজিদের মাধ্যমে তিনি পৌঁছাচ্ছিলেন, তা কি কেবল বনি ইসমাইলের জন্য ছিল? এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে:

وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَٰذَا الْقُرْآنُ لِأُنذِرَكُم بِهِ وَمَن بَلَغَ

“এই কুরআন আমার কাছে ওহি করা হয়েছে যেন এর মাধ্যমে আমি তোমাদের সতর্ক করি এবং যাদের কাছে এটা পৌঁছাবে তাদেরকেও।” (সুরা আনয়াম, ৬: ১৯)

অর্থাৎ বনি ইসমাইলের বাইরে যার কাছে এই বার্তা পৌঁছাবে, তার জন্যও এটা হেদায়েত। জাভেদ আহমেদ গামিদি এই আয়াতের তাফসিরে লিখেছেন:

“এটাই সেই বিষয়, যা সুরা আল-ফুরকানের আয়াত (২৫)-এ এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে: لِيَكُوْنَ لِلْعٰلَمِيْنَ نَذِيْرًا (যাতে এটা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য সতর্কবার্তা হয়)। এখান থেকে স্পষ্ট যে, কুরআন কিয়ামতের দিন পর্যন্ত একটি সতর্কবার্তার উপকরণ। আলেমরা যখন এটার প্রতি দাওয়াত দেবেন, তখন তাদের উচিত নিজ থেকে কিছু বলার পরিবর্তে এটাকে সতর্কবার্তা হিসেবে উপস্থাপন করা। আল্লাহর পরিচয় ও পরকালের জ্ঞান লাভের জন্য এর চেয়ে বড় কিছু নেই, যা মানুষকে জাগ্রত করতে পারে।” (আল-বায়ান, ২/২০)

এরপর, আল্লাহতায়ালা বনি ইসমাইলকে এই দায়িত্বও প্রদান করেছেন যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে হেদায়েত তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, তা পুরো পৃথিবীজুড়ে পৌঁছে দিতে হবে। এই দায়িত্ব কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে আল্লাহতায়ালা বলেছেন:

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا

“এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যবর্তী দল বানিয়েছি যেন তোমরা দুনিয়ার সব মানুষের কাছে (সত্যের) সাক্ষ্যদাতা হও এবং আল্লাহর রাসুল তোমাদের কাছে এই সাক্ষ্য দেন।” (সুরা বাকারা, ২:১৪৩)

জাভেদ আহমেদ গামিদি এ আয়াতের তাফসিরে লিখেছেন:

“মূলে এখানে وَسَط শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এটা ولد-এর মতো পুরুষ, মহিলা, একবচন ও বহুবচন সবকিছুর জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। এর অর্থ ‘মধ্যবর্তী’ এবং এই আয়াতে এটা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জাতি বনি ইসমাইলের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। সুরা হাজ্জ-এর ৭৮-নং আয়াতে هُوَ اجْتَبٰكُمْ (তিনি তোদেরকে নির্বাচিত করেছেন) এই শব্দগুলি প্রমাণ করে যে, আল্লাহতায়ালা তাদেরকে দ্বীনের এই সাক্ষ্যের জন্য নির্বাচিত করেছেন, যেমন তিনি আদম সন্তানদের মধ্যে কিছু মহান ব্যক্তিকে নবুয়ত ও রিসালাতের জন্য নির্বাচন করেন। এই আয়াতে কুরআন তাদেরকে اُمَّةً وَّسَطًا (মধ্যবর্তী দল) হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার মানে: এমন একটি জাতি, যার একদিকে আল্লাহ ও রাসুল এবং অন্যদিকে পৃথিবীর সব জাতি এবং তারা এইসব জাতির কাছে সত্যের সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আদিষ্ট। শাহাদাতের অর্থ: সাক্ষ্য দেয়া। যেমন সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়, ঠিক তেমনি যখন সত্য এই পর্যায়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় যে, তা গ্রহণ না করার কোনো সুযোগ থাকে না, তখন তাকে ‘শাহাদাত’ বলা হয়। এর অর্থ এই যে, আল্লাহতায়ালা কোনো ব্যক্তি বা জাতিকে তার বিচার প্রদর্শনের জন্য নির্বাচন করেন এবং তারপর কিয়ামতের আগে একটি ক্ষুদ্র কিয়ামত তাদের মাধ্যমে এই পৃথিবীতে স্থাপন করেন। তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, তারা আল্লাহর সাথে তাদের অঙ্গীকারে স্থির থাকলে এর পুরস্কার এবং বিচ্যুত হলে এর শাস্তি এই পৃথিবীতেই পাবে। ফলে তাদের অস্তিত্ব মানুষের জন্য আল্লাহর একটি নিদর্শন হয়ে ওঠে এবং তারা যেন আল্লাহকে তাদের সাথে পৃথিবীতে চলতে এবং বিচার করতে দেখে। এর সাথে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, যে সত্য তারা নিজ চোখে দেখেছে, সেই সত্য যেন তারা প্রচার করে এবং আল্লাহর হেদায়েত সম্পূর্ণ ও নিখুঁতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এটা হলো শাহাদাত। যখন এটা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এটা পৃথিবী ও আখিরাতে আল্লাহর বিচারের ভিত্তি হয়ে ওঠে।” (আল-বায়ান, ১/১৪২-১৪৩)

কুরআন মাজিদ তার প্রথম শ্রোতাদের, অর্থাৎ বনি ইসমাইলকে জাতি হিসেবে শাহাদাতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে এবং তাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে যে, তারা আল্লাহর বার্তা পৃথিবীর প্রতিটি কোণে পৌঁছাবে যেন সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় এবং আল্লাহর হেদায়েত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এই মহান দায়িত্ব আঞ্জামের সূচনা সাহাবায়ে কিরাম করেছেন, যখন তারা তাদের যুগের ইহুদি, খ্রিষ্টান ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। কুরআনের প্রথমদিকের সুরাগুলি এই দাওয়াতের ইতিহাস বর্ণনা করে, যা ধীরে ধীরে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সাহাবিগণের পর বনি ইসমাঈল তাদের সামর্থ্য ও উপায়-উপকরণ অনুসারে আল্লাহর বার্তাকে পৃথিবীর প্রতিটি কোণে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করেছে এবং এই কাজ আজও অব্যাহত আছে। যখন এই দাওয়াত বনি ইসমাইল ছাড়া অন্যদের কাছে পৌঁছায় এবং আমাদের এই বিশ্বাস নিশ্চিত হয় যে, কুরআন ও সুন্নাতের মাধ্যমে এটা সত্যিই আল্লাহর সত্যিকারের হিদায়াত, তখন আমরা এটাকে মেনে নিয়ে এর অধ্যয়ন শুরু করি। যেমনি আমরা কুরআন ও সুন্নাতের অধ্যয়ন শুরু করি, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাওয়াত ও শরিয়ত আমাদের সামনে সেভাবেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমনটি তা সাহাবিগণ ও প্রাথমিক শ্রোতাদের সামনে ছিল। এভাবে, এই হিদায়াত আমাদের জন্যও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়, যেমনটি ছিল বনি ইসমাইলের জন্য, কারণ এই বার্তা কোনো একটি জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি ব্যক্তি, যিনি এই হেদায়েতকে সত্যিকারের হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে, সে এই বার্তার সাথে যুক্ত হয়ে যায়।

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে: যখন আল্লাহতায়ালা তাঁর রাসলের শ্রোতাদের নামাজের নির্দেশনা দিলেন, তখন বললেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“হে মানুষেরা, তোমরা তোমাদের প্রভুর বন্দেগি করো, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকেও যেন তোমরা (তাঁর শাস্তি থেকে) বাঁচতে পারো।” (সুরা বাকারা, ২:২১)

এই আয়াত যদিও রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রথম শ্রোতাদের জন্য ছিল, তবে ‘আবদ’ এবং ‘মাবুদ’ এর সম্পর্কের ভিত্তিতে যে ইবাদত প্রয়োজন, তা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পর আমাদের জন্যও তেমনই আবশ্যক হয়, কারণ আমরা ‘আবদ’-এর অবস্থানে চলে আসি এবং আমাদের ‘মাবুদ’-এর হেদায়েতের প্রতি বাধ্য হয়ে পড়ি। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন:

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

“আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যেন তারা আমার বন্দেগি করে (এটাই তাদের প্রতি আমার দাবি)।” (সুরা যারিয়াত, ৫১:৫৬)

সুতরাং, ঈমান, আখলাক ও শরিয়তের সেইসব বিধান, যেগুলো বনি ইসমাইলের জন্য মানব হিসেবে আবশ্যক ছিল, আমাদের জন্যও তেমনই আবশ্যক। কারণ আমাদেরও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক প্রকাশ এবং মানবপ্রকৃতির হেদায়েতের বিস্তারিত প্রয়োজন, যেমনটি বনি ইসমাইলের ছিল। আল্লাহর আইন, অর্থাৎ শরিয়তের প্রতি আমরা একইভাবে বাধ্য, যেমনটি তারা ছিল। অর্থাৎ রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আবির্ভাব এই দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত সৃষ্টির জন্যই ছিল। কুরআন মাজিদ এই বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছে:

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ

“(হে নবী), আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। (সুরা সাবা: ২৮)

জাভেদ আহমেদ গামিদি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন:

“নবী (সা.) সম্পর্কে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এই কথা বলা হয়েছে যে, অন্যান্য রাসুলদের মতো তিনি শুধু তার জাতির প্রতি প্রেরিত হননি, বরং সমস্ত সৃষ্টির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। জাতির নেতাদের বিরোধিতা ও হঠকারিতা দেখে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই কারণে আওস ও খাযরাজের মানুষদের দাওয়াত দেন এবং তাদের পর আহলে কিতাব ও আশেপাশের শাসকগণকেও। এরফলে যারা ঈমান এনেছিল, তাদের সাহায্যের মাধ্যমেই বৈশ্বিকভাবে সত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল এবং নবুয়ত ও রিসালাতের পদ চিরকালের জন্য শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখন এই দাওয়াতের প্রচার সেই উম্মতের দায়িত্ব, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম, সেই আনসারদের তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ি হয়ে পৃথিবীতে বিদ্যমান। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জাতির লোকদেরকেও আল্লাহ এই সৌভাগ্য দান করেছিলেন যে, পরে তাদের অধিকাংশ ঈমান এনে সেই পদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল, যে পদকে কুরআনে ‘ইব্রাহিমি বংশের সাক্ষ্যদানের পদ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।” (আল-বায়ান, ৪/১৯৬)

এভাবে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাওয়াত এবং নবীদের হেদায়েতের প্রতিটি দিক আমাদের জন্যও তেমনি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যেমনটি প্রথম জাতির জন্য ছিল। সুতরাং, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাওয়াত এবং হেদায়েত কোনো একটি জাতি বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, সমস্ত নবী একই দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বার্তা পুরো মানবজাতির জন্য।