কুরআন ও সুন্নাহ হলো দ্বীনের একমাত্র উৎস। বুখারিসহ অন্যান্য হাদিসগ্রন্থ সরাসরি দ্বীনের উৎস নয়; বরং রাসুল (সা.)-এর যুগের ঘটনাবলির ঐতিহাসিক দলিল। হাদিস মূলত রাসুল (সা.)-এর জীবনচরিত, উত্তম আদর্শ, দ্বীনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, কুরআনের তাফসির, ইজতিহাদ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে সংকলিত হয়েছে। সুতরাং অবশ্যই হাদিসকে কুরআনের আলোকে, যুক্তি ও জ্ঞানের ভিত্তিতে এবং মুহাদ্দিসগণের নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই করতে হবে। কোনো হাদিস নির্ভরযোগ্যতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলে তা অনুসরণ করা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক, কারণ এটি কুরআনের নির্দেশ। তবে মনে রাখা জরুরি, কুরআনের মতো ইজমা ও তাওয়াতুরের ভিত্তিতে হাদিস আমাদের কাছে পৌঁছেনি। হাদিস আমাদের কাছে একক বর্ণনা (খবর-ই ওয়াহিদ) রূপে পৌঁছেছে। অতএব বুখারিসহ অন্যান্য হাদিসগ্রন্থ ওহির মতো দ্বীনের কোনো চূড়ান্ত উৎস নয়, এগুলো ঐতিহাসিক দলিল।
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক জাভেদ আহমেদ গামিদি সহিহ বুখারির শিরোনামকে উদ্ধৃত করে বলেছেন যে, এই গ্রন্থের শিরোনামই প্রমাণ করে এটি একটি ইতিহাসের গ্রন্থ।
দক্ষিণ এশিয়ার আরেকজন বিশিষ্ট হাদিস বিশারদ মাওলানা মানাযির আহসান গিলানি (রহ.) সহিহ বুখারি সম্পর্কে তার গ্রন্থ ‘তাদভিনে হাদিসে’-এর মধ্যে লিখেছেন:
“সত্যি বলতে, রাসুল (সা.)-এর যুগের মহত্তম, বিস্ময়কর ও বৈপ্লবিক ইতিহাসেরই নাম হাদিস। হাদিসশাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম—ইমাম বুখারি তার গ্রন্থের যে নাম রেখেছেন, কেবল তার দিকেই লক্ষ করলেই আমি যা বলেছি, তা সহজেই বুঝতে পারবেন। যারা বোঝেন, তারা সবসময়ই এই বিদ্যাকে এমন দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখেছেন। ইমাম বুখারি তার গ্রন্থের নাম রেখেছেন: ‘আল-জামি’ আস-সহিহ আল-মুসনাদ আল-মুখতাসার মিন উমুরি রাসুলিল্লাহ (সা.) ওয়া আয়্যামিহি’—অর্থাৎ ‘রাসুল (সা.)-এর বিষয়াবলি ও জীবনের দিনগুলোর উপর নির্ভর করে সংকলিত, সংক্ষিপ্ত সহিহ গ্রন্থ।’”
অনেকে বলেন, সহিহ বুখারির কিছু পাণ্ডুলিপির শিরোনামে ‘ওয়া সুনানিহি’ শব্দটিও যুক্ত আছে। যার অর্থ দাঁড়ায় রাসুল (সা.)-এর সুন্নাতের বর্ণনা। সুতরাং সহিহ বুখারি কোনো ইতিহাসের গ্রন্থ নয়, বরং এটি সুন্নাতের একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ সংকলন। তাদের এ কথা ঠিক যে, সহিহ বুখারির কিছু পাণ্ডুলিপির শিরোনামে ‘ওয়া সুনানিহি’ শব্দটি যুক্ত আছে। কিন্তু তাদের যুক্তি সঠিক নয়। কেননা সহিহ বুখারির প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে শিরোনাম বর্ণনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। কিছু পাণ্ডুলিপিতে শিরোনাম হিসেবে ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিষয়াবলি ও দিনগুলি’ ব্যবহৃত হয়েছে, আবার কিছু পাণ্ডুলিপিতে ‘ওয়া সুনানিহি’ (এবং তার সুন্নাতসমূহ) শব্দটিও যুক্ত রয়েছে।
এ ধরনের পার্থক্য প্রমাণ করে যে, এটি একটি ইতিহাসের গ্রন্থ। কারণ ইতিহাসের গ্রন্থ ব্যতীত এ ধরনের বৈচিত্র্য তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। শিরোনামের এই বৈচিত্র্য এ গ্রন্থের ঐতিহাসিক বিকাশের একটি শক্তিশালী প্রমাণ বহন করছে। যাইহোক, যেসকল নির্ভরযোগ্য মুসলিম হাদিস বিশারদ সহিহ বুখারির পাণ্ডুলিপি সংকলন করেছেন তাদের কেউই ‘ওয়া সুনানিহি’ শব্দটি সহিহ বুখারির শিরোনামে যুক্ত করেননি।
যেমন, মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল-ফারাবরি (মৃত্যু ৩২০ হিজরী), আবু যর আল-হেরভি (মৃত্যু ৪৩৪ হিজরী), ইবনু তাহির আল-মকদিসি (মৃত্যু ৫০৭ হিজরী), তারা সকলেই ছিলেন সহিহ বুখারির পাণ্ডুলিপি সংকলক এবং তারা কেউই ‘ওয়া সুনানিহি’ শব্দটি শিরোনামে যুক্ত করেননি। একইভাবে ইবনু খায়র আল-ইশবিলি (মৃত্যু ৫৭৫ হিজরী), যিনি সূচিবিশারদ হিসেবে খ্যাত, তিনি তার বইয়ের মধ্যে সহিহ বুখারির শিরোনামে ‘ওয়া সুনানিহি’ শব্দটি যুক্ত করেননি।
এছাড়াও ‘ওয়া সুনানিহি’ শব্দটি সহিহ বুখারির শিরোনামে যুক্ত থাকা কোনো জটিলতা তৈরি করে না। কেননা এই গ্রন্থের অভ্যন্তরীণ কাঠামো প্রমাণ করে যে, এটি একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। তৎকালীন সময়ে ইতিহাসের গ্রন্থ এভাবেই সংকলিত হত।
এ সম্পর্কে ইমাম শাতিবি (রহ.) বলেন: “ইতিহাস হলো সেই শাস্ত্র, যার মাধ্যমে পূর্ববর্তী জাতি, নবী এবং তাদের মতো অন্যান্য ব্যক্তিদের অবস্থা জানা যায়। তাদের ধর্মীয় ও দুনিয়াবি জীবনে কী কী ঘটনা ঘটেছিল তা জানা যায়। এতে মুতাওয়াতির ও আহাদ উভয় ধরনের খবরই অন্তর্ভুক্ত। কারণ এগুলি সবই ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা।” (মুওয়াফাকাত, খণ্ড ২, কিতাবুল ইলম, পৃষ্ঠা: ৬০)
ইবনু খালদুন তার মুকাদ্দিমাতে লিখেছেন, “হাদিস হলো রাসুল (সা.)-এর সূত্রে প্রাপ্ত সংবাদ, যা সাহাবা, তাবেঈন এবং পরে বিভিন্ন শহরের আলেমরা বর্ণনা করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ইতিহাসের বর্ণনার সংকলন।”
ইমাম খতিব বাগদাদি তাঁর ‘আল-কিফায়াহ ফি ইলমির-রেওয়ায়াহ’ গ্রন্থে লিখেছেন: “যেসব খবর নবী (সা.)-এর থেকে বর্ণিত, সেগুলো বর্ণনা করতে হলে তদন্ত এবং সতর্কতার প্রয়োজন। কারণ এগুলি ধর্মীয় বিধি-বিধান এবং নবী (সা.)-এর সীরাতের ঐতিহাসিক দলিল।”
ইমাম ইবনু আবদুল বার হাদিস সম্পর্কে বলেছেন: “আর যেসব আহাদ (একক) বর্ণনা (হাদিস) রয়েছে, সেগুলো অনুমানভিত্তিক, এগুলো নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে না এবং এগুলোর উপর আমল করা বাধ্যতামূলক, তবে এগুলো থেকে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ হয় না।” (তামহিদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা: ২-৩)
সুতরাং আমাদের বিখ্যাত হাদিস বিশারদগণ বহু আগে থেকেই হাদিসগ্রন্থগুলোকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারা এগুলোকে দ্বীনের চূড়ান্ত দলিল হিসেবে কুরআন ও সুন্নাতের উপরে প্রাধান্য দেননি। তারা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, অবশ্যই হাদিস অনুসরণ করতে হবে, তবে তা যাচাই-বাছাই করে এবং ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে; ওহি বা দ্বীনের অকাট্য উৎস হিসেবে নয়।