আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহে এই গ্রন্থে আমি পবিত্র কুরআনের নাজ়ম (সূরা ও আয়াতের পারস্পরিক সামঞ্জস্য ও যোগসূত্র) আবিষ্কারের প্রয়াস করেছি। আমার উদ্দেশ্য আল্লাহর দীপ্তিময় কিতাব পবিত্র কুরআনের এমন একটি সহজবোধ্য ও স্পষ্ট তাফসির রচনা করা, যা হবে রাসূল(সা.)-এর পর মুসলমানদের মধ্যে উদ্ভূত সমস্ত মতভেদ ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত। আমি কুরআনের প্রতিটি আয়াত ব্যাখ্যা করার সময় তার পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছি। এছাড়াও আমি সূরাগুলোর মধ্যে যে ধারাবাহিকতা ও অন্তর্নিহিত সংযোগ রয়েছে, তা অনুধাবনের জন্য প্রসঙ্গানুযায়ী গভীর পাঠ ও বিশ্লেষণ করেছি। এভাবে যখন কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার দিকে পৌঁছেছি, তখন আমি তা যুক্তি ও বাস্তব প্রমাণে দ্বারা উপস্থাপন করেছি। চলুন এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা করি ।
নাজম
নাজ়ম বা কুরআনের যোগসূত্র উন্মোচনের জন্য আমি কুরআনের বাণীর গভীরে প্রবেশ করেছি। কুরআনকে আমি সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি ও মননশীলতার মাধ্যমে অধ্যয়ন করেছি। আল্লাহর বাণীকে ব্যাখ্যা করার এই প্রচেষ্টা আমি নিরবিচারে আল্লাহর কিতাবকেই আঁকড়ে ধরেছি। আমার পথপ্রদর্শক একমাত্র মহান আল্লাহ, যিনি আমাকে এই মহান কিতাবের অন্তর্নিহিত যোগসূত্র ও বিন্যাস উপলব্ধির জন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমি কারো কাছ থেকে ধার করি নাই। এটি কোনো প্রচলিত বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পন্থা নয়। তবে এটাও আমি বিনয়ীভাবে স্বীকার করি যে, আমি প্রথম ব্যক্তি নই, যিনি কুরআনের নাজ়ম উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন।
অতীতের বহু ইসলামের বিদ্বান ব্যক্তিবর্গ এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের গবেষণার ফলাফল লিখিত আকারেও উপস্থাপন করেছেন। বহুবিদ্যাশাস্ত্রে পারদর্শী আল্লামা সুয়ূতী তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইতক্বান ফী ‘উলূমিল কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
أفرده بالتاليف العلامة أبو جعفر بن الزبير شيخ أبي حيان في كتاب سماه البرهان في مناسبة ترتيب سور القرآن ومن أهل العصر الشيخ برهان الدين البقاعي في كتاب سماه نظم الدرر في تناسب الآي والسور
আবু হাইয়ানের শিক্ষক, আল্লামা আবু জাফর ইবন যুবায়র, এই বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেছিলেনঃ। যার নাম ‘আল-বুরহান ফী মুনাসাবাতিস-সুয়ারিল কুরআন’(পবিত্র কুরআনের সূরাসমূহের আন্তঃসংযোগ নিয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ), যে গ্রন্থের মধ্যে কুরআনের সূরাগুলোর পরস্পর সংযোগ ও ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের যুগের একজন আলেম, শায়খ বুরহানুদ্দীন বকায়ী, কুরআনের নাজমের বিষয়ে একটি তাফসীর রচনা করেছেন। তাফসীরটির নাম ‘নযমুদ-দুরার ফী তানাসুবিল আয়ি ওয়াস-সুয়ার’ অর্থাৎ আয়াত ও সূরার পরস্পর সামঞ্জস্য সম্পর্কে মুক্তোর মালা বিন্যাসের মতো ব্যাখ্যা। যেখানে তিনি কুরআনের আয়াত ও সূরাসমূহের পারস্পরিক সংগতির উপর গভীর মনোযোগ দিয়েছেন।
আল্লামা সুয়ূতীর আরো একটি একটি গ্রন্থ রয়েছে যেখানে তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত ও সূরাসমূহের অন্তর্নিহিত সামঞ্জস্য অর্থাৎ নাজম এবং কুরআনের অতিপ্রাকৃত অলৌকিকত্ব ও ভাষাশৈলী সংক্রান্ত অন্যান্য দিক সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
علم المناسبة علم شريف قل إعتناء المفسرين به لدقته وممن اكثر منه الإمام فخر الدين فقال في تفسيره أكثر لطائف القرآن مودعة في التربيتات والروابط
সূরা ও আয়াতের পারস্পরিক সংযোগ ও অন্তর্নিহিত সামঞ্জস্য বোঝার চেষ্টা করা মূলত জ্ঞানের সর্বোচ্চ মর্যাদার বিষয়।তবে এটি জটিল ও সূক্ষ্ম হওয়ায় মুফাসসিরগণ এ বিষয়ের তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ দিয়েছেন। ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী এই বিদ্যার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তিনি বলেন: “কুরআনের অধিকাংশ সূক্ষ্মতা ও প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে এর সূরা ও আয়াতের সুচারু বিন্যাস ও পরস্পরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ব্যবস্থার মধ্যে।”
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী সূরা হা-মীম সাজদার ৪৪ নম্বর আয়াত—”وَلَوْ جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا أَعْجَمِيًّا” এর ব্যাখায় তার রচিত তাফসীরে লিখেছেন,
نقلوا في سبب النزول هذه الآية أن الكفار لأجل التعنت قالوا لولا نزل القرآن بلغة العجم فنزلت هذه الآية و عندي أن أمثال هذه الكلمات فيها حيف عظيم على القرآن لأنه يقتضي ورود آيات لا تعلق للبعض فيها بالبعض و أنه يوجب أعظم أنواع الطعن فكيف يتم مع إلتزام مثل هذا الطعن إدعاء كونه كتابا منظما فضلا عن إدعاء كونه معجزا بل الحق عندي أن هذه السورة من أولها إلى أخرها كلام واحد
আলেমগণ মনে করেন করেছেন, এই আয়াতটি সেই সময় নাজিল হয়েছিল, যখন কুরাইশ গোত্রের লোকেরা অভিযোগ করে বলেছিল: “কুরআন কোনো অনারব ভাষায় কেন অবতীর্ণ হলো না?” ইমাম রাযী বলেন, আমি মনে করি, এ ধরনের ধারণা পবিত্র কুরআনের মর্যাদাকে মারাত্মক প্রশ্নের সম্মুখীন করে। এর অর্থ দাঁড়ায়, কুরআনের আয়াতসমূহ বিচ্ছিন্ন, যেগুলোর মধ্যে কোনো সুসংবদ্ধ যুক্তিগ্রাহ্য সম্পর্ক নেই। বরং এর ফলে আল্লাহর কালামের ওপর এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয়, যা মেনে নিলে কুরআনের পূর্ণাঙ্গতা ও ধারাবাহিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়—এমনকি তা আর অলৌকিক বা অপারাজেয় কালাম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই সূরাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক ও সংবদ্ধ বক্তব্যের রূপে রচিত।
সূরার মূল বিষয়বস্তু সংক্ষেপে উপস্থাপন করার পর ইমাম রাযী বলেন,
كل من أنصف و لم يتعسف علم أنا إذا فسرنا هذه الآية على الوجه الذي ذكرنا صارت هذه السورة من أولها إلى آخرها كلاما واحدا منتظما مسوقا نحو غرض واحد فيكون هذا التفسير أولى مما ذكروه
প্রত্যেক ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন, যদি এই আয়াতের ব্যাখ্যা আমাদের পদ্ধতিতে করা হয়, তবে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সম্পূর্ণ সূরাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল, সংবদ্ধ ও নিরবিচ্ছিন্ন বক্তব্য; যা একটি একক মূল উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর হয়েছে। এমন ব্যাখ্যা অবশ্যই সেইসব সাধারণত প্রচলিত ব্যাখ্যার তুলনায় শ্রেষ্ঠ, যেগুলোতে এই ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্য অনুপস্থিত।
এ পর্যন্ত আমরা পবিত্র কুরআনের নাজমের পক্ষে যারা আলোচনা করেছেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছি। তবে এমন অনেক আলেমও ছিলেন, যারা বিশ্বাস করতেন কুরআনে কোনো ধারাবাহিকতা বা যোগসূত্র নেই।
যেমন শায়খ ‘ইজ্জুদ্দীন আস্-সালাম বলেন,
فأن القرآن نزل في نيف و عشرين سنة في أحكام مختلفة شرعت لأسباب مختلفة و ما كان كذالك لا يتأتى ربط بعضه ببعض
(পবিত্র কুরআন বিভিন্ন পরিস্থিতিতে, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে, ভিন্ন ভিন্ন হুকুম ও নির্দেশনাসহ দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে।} এভাবে যে কিতাব অবতীর্ণ হয়, তার বিভিন্ন অংশের মধ্যে কোনো স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বা সংগতিপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সম্ভব নয়।
আমরা দেখেছি, কুরআনের নাজম সম্পর্কে দুই ধরনের মতবাদ বিদ্যমান এবং উভয় মতেরই যথার্থ সমর্থক রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রথম মতের পক্ষপাতী।
উল্লেখিত তথ্যসমূহের আলোকে আমি দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানে তুলে ধরতে চাই।
প্রথমত, আমাদের পূর্ববর্তী আলেমগণ কুরআনের নাজমকে সম্পূর্ণভাবে অবহেলা করেননি। বরং কেউ কেউ এই বিষয়টিকে মনোযোগ দিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, পবিত্র কুরআনের নাজম কুরআন ব্যাখ্যা করে স্পষ্ট করে দেখানো করা একটি কঠিন কাজ, যে কাজ এখন পর্যন্ত খুবই স্বল্প পরিসরে করা হয়েছে। এটি এক বিরাট ধনরাশি, যার মাত্র অল্পাংশই আজ পর্যন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
মহান আল্লাহর রহমতে আমি প্রথমে পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারা এবং সূরা কাসাসের যোগসূত্র আবিষ্কার করেছি। কুরআনের নিজস্ব বাণী আমাকে এই আবিষ্কারের পথে পরিচালিত করেছে, আমি কোনো বাইরের উৎসের সাহায্যে এই অনুসন্ধান করিনি। আল্লাহর অনুগ্রহে আমার সবথেকে প্রিয় গুনগ্রন্থ পবিত্র কুরআন পাঠ করা সবসময় আমার অন্তরাত্মার প্রশান্তির একমাত্র মাধ্যম। বহুবার আমি সেই প্রসিদ্ধ বক্তব্যের সম্মুখীন হয়েছি, অর্থাৎ কুরআন টুকরো টুকরো আকার অবতীর্ণ হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত বাণী। তবে দুইটি দীর্ঘ সুরার যোগসূত্র আবিষ্কার করার পর আমি এই বিষয়ে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ি। মূলত এটিই আমার জীবনের প্রথম দিকের ঘটনা যখন আমি ছাত্র ছিলাম। আমার একাডেমিক পড়াশোনার কারণে তখন আমি নিজের সমস্ত সময় কুরআনকে উৎসর্গ করতে পারিনি। কিন্তু প্রায় দশ বছর পর আল্লাহ আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন, যাতে আমি পবিত্র কুরআনের যোগসূত্র নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করতে পারি। প্রথমে আমি এটি নিয়ে প্রায় এক বছর নিরপেক্ষভাবে অধ্যয়ন করেছি। এরপর আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। তারপর, এই অনুসন্ধানের ফলাফল একাডেমিক মহলে উপস্থাপনের চিন্তা আমার মনে উদয় হয়। তবে আমি এই কাজের গুরুত্ব ও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিবেচনা করে সেই পথে এগোতে আগ্রহী হইনি। তাই দীর্ঘদিন ধরে এই দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআনের বাণীকে পুনরায় পরীক্ষা করতে শুরু করি।এই সময় আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি তিনি যেন আমাকে অজ্ঞতা ও অন্তর্জগতের প্রলোভন থেকে রক্ষা করেন। সত্য আমার সামনে বহুদিন ধরে স্পষ্ট ও সুপ্রকাশিত অবস্থায় ছিল। আর এটা উচিত ছিল যে আমি তাড়াতাড়ি এই সত্য প্রকাশ করে দেবো। তবুও আমি সবসময় এই পৃথিবী থেকে নিরাপদে বিদায় নিতে চেয়েছিলাম, যেন এই মহান আবিষ্কারের দায়বদ্ধতা আমার কাঁধে না আসে।
আমি নিজেকে সেই সকল সৎ বা অসৎ ফলাফলের দায়িত্ব থেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিলাম, যা আমার গবেষণার মাধ্যমে সৃষ্ট হতে পারে। তবে বেশ কিছু কারণে আমি বাধ্য হলাম এই সত্য প্রকাশ করে দিতে। তখন আমি আমার দ্বিধাবিভক্ত মনকে পাশ কাটিয়ে এই বিশাল দায়িত্ব আমার কাঁধে তুলে নিলাম। যদিও আমি এর জন্য অনিচ্ছুক ছিলাম।
আমি এ বিষয়টি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি যে, কুরআনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে যে মতপার্থক গুলো সৃষ্টি হয়েছে তার প্রধান কারণ হলো নাজম বা কুরআনের যোগসূত্রের প্রতি যথাযথ মনোযোগ না দেওয়া।তারা যদি নাজম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতেন এবং সূরার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুর সাথে পরিচিত হতেন, তবে সকল বিভেদ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে দূর হয়ে যেত।
সকলেই মিলিত হতো একটি সাধারণ পতাকা তলে। একক শব্দকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতেন যেন একটি সুসজ্জিত বৃক্ষ, যার মূলোৎপাটন দৃঢ়, শাখাগুলো আকাশ ছুঁয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, এই মতপার্থক্য রোধ করা সম্ভব হয়নি, যদিও আল্লাহ তাঁর বাণী আমাদের কে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন।
তিনি বলেন,
واعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ اللّهِ جَمِيعًا وَلاَ تَفَرَّقُواْ
আর সব মিলিয়ে আল্লাহর রশিতে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, এবং ঐক্যবদ্ধ থেকো; বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না। (সূরা আল-ইমরান: ১০৩)
মানুষ আল্লাহর এই রশিকে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। প্রতিটি ফিরকা এক একটি পূর্বধারণার চশমা চোখে দিয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা করেছে। ফলে তারা কুরআনের মূল পাঠ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। অথচ কুরআন বোঝার জন্য নাজম একমাত্র সত্য ও সঠিক পথ, যার প্রতি কারো মনোযোগ নেই। এই কাঠামো একমাত্র ঢাল, যা বিদআতীদের খেয়ালখুশি অনুযায়ী কুরআনের ব্যাখ্যা থেকে মুসলিমদের রক্ষা করতে পারে, কপট ও বক্রচিন্তাধারী লোকদের আক্রমণ থেকে কুরআনকে নিরাপদ রাখতে পারে।
ধর্ম বিদ্বেষীরা প্রতিনিয়ত পবিত্র কুরআনের বিরুদ্ধে আপত্তির তীর ছুঁড়ে চলছে। তাদের অভিযোগ হলো, পবিত্র কুরআন একটি অগোছালো গ্রন্থ। এই মহাগ্রন্থে কোনো প্রকার সুবিন্যস্ত রচনার ছাপ নেই। আল্লাহর এই পবিত্র বাণীকে এমন জঘন্য ও ধৃষ্টতাপূর্ণ আপত্তি থেকে মুক্ত করা এবং সত্যকে উন্মোচন করাই ছিল মুসলিম আলেমদের দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য মুসলিম আলেমগণ এই ধর্মবিদ্বেষীদের জবাব দিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু তারা অভিযোগকারীদের কাছে আপোষ ও আত্মসমর্পণ করেছে। এই অবস্থায় আমি নীরব দর্শকের মতো বসে থাকতে পারেনি। আমি স্পষ্টভাবে এটি উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, ধর্মবিরোধীদের এই আপত্তিগুলো অগ্রহণযোগ্য ও ভিত্তিহীন। আমি দেখতে পেলাম সত্য মিথ্যার নিচে চাপা পড়তে যাচ্ছে তাই আমার পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব হয়নি।
এছাড়াও এটি একটি অকাট্য সত্য, প্রত্যেক বক্তব্যের মধ্যে নাজম বা যোগসূত্র থাকবেই। যদি যোগসূত্র না থাকে তাহলে বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘তার তাৎপর্য ও গভীর বার্তা’ অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। একটি সম্পূর্ণ রচনা কেবল তার অংশসমূহের যোগফল নয়; বরং এতে এমন কিছু অতিরিক্ত তাৎপর্য নিহিত থাকে, যা কেবল সামগ্রিক রূপেই ধরা দেয়। যেমন আঙ্গুর আর তার থেকে তৈরি সরাব—এই দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যদি কেউ কোনো বক্তব্যের যোগসূত্র সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারে তাহলে তার কাছে সেই বক্তব্য সম্পূর্ণ অর্থহীন মনে হয়। এ অবস্থায় সে এক প্রকার অন্ধ অবস্থায় থাকে—তেমনই অন্ধ যেমন ছিল আহলে কিতাবীরা, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
এরপর যে গ্রন্থটির মাধ্যমে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল সেটির একাংশ তারাও ভুলে গিয়েছে। তাই তাদের উভয়ের মাঝে আমি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত শত্রুতা ও বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছি। (সূরা মায়েদা: ১৪)
আমার আশঙ্কা, মুসলিমদের মধ্যে যে শত্রুতা ও বিরোধের আগুন জ্বলে উঠেছে, তার মূল কারণ আমরা পবিত্র কুরআনের গভীর অর্থ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এবং কুরআনের ধারাবাহিকতা ও সামগ্রিক যোগসূত্র উপেক্ষা করেছি। আল্লাহ না করুন, এই অকল্যাণ সহজে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহর বাণীর অর্থ নিয়ে মতবিরোধের অবশ্যম্ভাব্য ফল হলো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বিভাজন। ফলে আমরা ঠিক সেই পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছি, যা আহলে কিতাবদের ক্ষেত্রে আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের সামনে তখনো আশার দ্বার খোলা ছিল, কেননা তাদের সামনে ছিল শেষ নবী (সা.) এবং চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ ওহি। কিন্তু আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই— তাই আমাদের ফিরতেই হবে কুরআনের দিকেই।
মানুষের মধ্যে যে স্বাভাবিক দুর্বলতা রয়েছে—তা কুরআন স্বীকার করে নিয়ে তার আলোকে বিধানকে ধাপে ধাপে প্রয়োগ করেছে। এ ধরনের দুর্বলতা মানুষের স্বভাবগত—এই সত্যটি নিম্নোক্ত আয়াতে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে,
. (কারণ যে দায়িত্ব পালন করার জন্য আপনাকে পাঠানো হয়েছে তা একটি ভারি দায়িত্ব)। এর আগে আমি আদমের উপর একটি অঙ্গীকার পালনের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলাম। কিন্তু তিনি তা ভুলে গেলেন এবং আমি তার মধ্যে ইচ্ছার দৃঢ়তা পাইনি। (সূরা ত্ব-হা: ১১৫)
মানুষের দুর্বলতাকে বিবেচনা করে যে সহজতর আয়াত নাজিল করা হয়েছে, তা পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত থেকেও আমরা সহজেই বুঝতে পারি:
এখন অবশ্য তিনি তোমাদের বোঝা কমিয়ে দিয়েছেন; কারণ তিনি জেনেছেন যে, তোমাদের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা এসে গিয়েছে। (সূরা আনফাল: ৬৬)
এই আয়াতটি সরাসরি তার আগের আয়াতের আদেশের পরেই অবতীর্ণ হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছিল, হে নবী, আপনি এই মুমিনদেরকে (ওই) যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করুন (যার নির্দেশ পূর্বে দেয়া হয়েছে)।
অর্থাৎ এই আয়াতের মাধ্যমে পূর্বের আদেশকে বাতিল করা হয়েছে। অনুরূপভাবে, সূরা মুজ্জম্মিলের প্রথম আয়াত ও শেষ আয়াতের নাযিল হওয়ার সময় কালের মধ্যে অনেক বছর পার্থক্য রয়েছে। প্রথম আয়াতগুলোতে মুসলিমদের রাত্রি জাগরণের আদেশ দেওয়া হয়েছে, আর শেষ আয়াতটি সেই আদেশ বাতিল করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। এখানে উভয় আদেশের অবতরণের সময়ের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, বাতিলকারী আয়াতটি বাতিলকৃত আদেশের পরেই রাখা হয়েছে। রমজান মাসের রাতগুলোতে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতির আয়াতের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুসৃত হয়েছে।
এছাড়াও যেসব আয়াতে স্ত্রীদের জন্য উইল বা বিবাহিত সম্পত্তির বিধান রাখার আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও এই বিষয়টি প্রমাণ করতে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। আমি সূরার ব্যাখ্যায় আলোচনা করেছি, শেষের এই আয়াতটি পুরো অধ্যায়কে পরিপূর্ণ করে এমন আয়াতগুলোর মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। বাস্তবে এই আয়াতটি সেই প্রথম পরিপূরক আয়াতের পর খুব সূক্ষ্মভাবে রাখা হয়েছে। এধরনের ব্যাখ্যামূলক আয়াত নাযিল হওয়ার পর প্রায়শই বলা হয়, :
এভাবেই আল্লাহ মানুষদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট ও স্পষ্ট করে দেন। (সূরা বাকারা: ১৮৭)
আমার মতে এই বেক্ষামূলক আয়াত নাযিল হওয়ার মূল কারণ হলো আল্লাহর সেই প্রতিশ্রুতি যা সূরা কিয়ামায় উল্লেখ করা হয়েছে,
এরপর [প্রয়োজন হলে] এটির ব্যাখ্যা করাও আমারই দায়িত্ব। (সূরা কিয়ামা: ১৯)
আর এটি সেই প্রার্থনার প্রতিফল যা আল্লাহ নিজেই রাসুল (সা.)কে শিখিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে,
অতএব প্রকৃত বাদশাহ আল্লাহ সুমহান। (তিনি তার প্রজ্ঞা অনুসারে এই কুরআন এভাবেই ধীরে ধীরে অবতীর্ণ করবেন, এই বিষয়টি আপনি জেনে রাখুন) আর এই কুরআন আপনার কাছে ওহি করার কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই এটিকে পেতে আপনি তাড়াহুড়ো করবেন না এবং প্রার্থনা করতে থাকুন: ওগো আমার প্রভু, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন। (সূরা ত্ব-হা: ১১৪)
হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যখন কুরআনের কোনো আয়াত নাযিল হতো ঠিক তখনই রাসূল (সা.) সেই আয়াতকে নির্দিষ্ট একটি সূরার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সাহাবীদের নির্দেশ দিতেন। নবী (সা.)-এর সরাসরি নির্দেশে কুরআনের সেই অংশ যথাযথ স্থানে সংরক্ষিত হতো। হাদিসের একাধিক বর্ণনা থেকে জানা যায়, কখনো কখনো একটি সূরা সম্পূর্ণ হওয়ার পর ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) নবী (সা.)-এর সামনে পুরো সূরাটি পাঠ করতেন। আমার মতামত অনুযায়ী, এটি সূরা কিয়ামার উল্লেখিত ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি—‘জম‘ (সংকলন) এবং ‘কুরআন’ (পাঠ)-এর পূর্ণতা—সাধনেরও একটি বাস্তব রূপ। নবী (সা.)-কে এই বিধান ও পাঠ অনুসরণের জন্যই আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কুরআনের সূরা ও আয়াতসমূহের বিন্যাস সম্পূর্ণ উম্মাহর দ্বারা স্বীকৃত।] ইসলামের সকল ফেরকা ও মতবাদ— নিজেদের মধ্যে যতই বিভাজনে লিপ্ত থাকুক না কেন— তারা সবাই একই পাঠ, একই আয়াতক্রম এবং একই সূরাবিন্যাস অনুসরণ করে।
আরেকটি বিষয় যা কুরআনের নাজম সম্পর্কিত আমার এই মতামতকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে, তা হলো, সেই মানুষদের দৃঢ় বিশ্বাস, যাদের অন্তর আল্লা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, যার ফলে তারা কোরআনের সূক্ষ্ম বিন্যাস ও গঠন উপলব্ধি করতে পেরেছে। এই বিদ্বানগণ আল্লাহর কিতাবের সূক্ষ্ম রচনাবিন্যাসের মাঝে নিহিত কিছু বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের মতামত হলো—আল্লাহর এই কিতাব এক অফুরন্ত জ্ঞানের ভান্ডার, এটি একটি বিস্ময়কর কুদর, যার গভীরত্বে প্রবেশ করার জন্য তার গঠনতত্ত্ব ও বিন্যাস বিশ্লেষণ করতে হয়। আর এটি করতে পারলি একজন পাঠক কুরানের গভীরে প্রবেশ করতে পারবে। কুরআনের গভীরে পৌঁছানোর জন্য তারা দিন দিন আরও উৎসাহিত হবে।
ফলে আল্লাহ তাদের প্রচেষ্টাকে সফল করবেন পাঠক কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, আল্লাহ্ তাদের সামনে জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। আল্লাহর কিতাব এক অগাধ জ্ঞানের মহাসাগর, যার বিস্ময় ও রত্নভান্ডার কখনো শেষ হবে না। সূর্যের আলোকে কেউ কি কখনো পুরোপুরি ধারণ করতে পেরেছে? কুরআনের সকল জ্ঞান কি কেউ কখনো পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পেরেছে? ভুল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এমন দাবিই বা কে করতে পারে?
কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা একজন জ্ঞান অনুরাগী শিক্ষার্থীর কুরআন পাঠের উৎসাহ ও জ্ঞানপিপাসাকে বিন্দুমাত্র দমন করতে পারে না। বরং তারা কৃতজ্ঞতাভরে নিজেদের অর্জনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে এবং সদা অনুসন্ধানী চিত্তে জ্ঞানের এই অফুরন্ত সম্পদের সন্ধান চালিয়ে যায়। আপনি কি দেখেন না, যারা এই জ্ঞানের কোনো অংশ লাভ করেছেন, তাঁরা সর্বদা আল্লাহর এই অতুলনীয় অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন?
ইমাম সূউতী (রহ.) বলেছেন,
أول من أظهر علم المناسبة الشيخ أبوبكر النيشابورى و كان غزير في الشريعة والأدب و كان يقول على الكرسي إذا قرئ عليه لما جعلت هذه الآية إلى جنب هذه و ما الحكمة في جعل هذه السورة إلى جنب هذه السورة و كان يزري على علماء بغداد لعدم علمهم بالمناسبة
পবিত্র কুরআনের আয়াত ও সূরার পারস্পরিক সংযোগ ও সামঞ্জস্য অধ্যয়নের গুরুত্বের যিনি সর্বপ্রথম তুলে ধরেন, তিনি হলেন শায়খ আবু বকর নিশাপুরী। তিনি ছিলেন ইসলামী আইনশাস্ত্র ও সাহিত্যজ্ঞানের এক বিশিষ্ট মনীষী। তিনি শিক্ষকের আসনে বসে তার সামনে পাঠ করা কুরআনের আয়াতগুলো ব্যাখ্যা করতেন এবং ব্যাখ্যার সময় বিশেষ কোনো আয়াত কেন একটি নির্দিষ্ট আয়াতের পরে এসেছে, কিংবা একটি সূরার পর আরেকটি সূরা কেন রাখা হয়েছে—তা ব্যাখ্যা করে এর অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা ও হিকমতের দিকগুলো তুলে ধরতেন। তিনি প্রায়ই বাগদাদের বিদ্বানদের সমালোচনা করতেন এই বলে যে, তারা কুরআনের আয়াত ও সূরার পারস্পরিক সংযোগ-সম্পর্কিত জ্ঞানে দুর্বল ও উদাসীন।
ইমাম সূউতী (রহ.) ইবনে আরাবীর একটি বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন,
إرتباط آي القرآن بعضها ببعض حتى يكون كالكلمة الواحدة متسقة المعاني منتظمة المباني علم عظيم لم يتعرض له إلا عالم واحد عمل فيه سورة البقرة ثم فتح الله لنا فيه فلم نجد له حملته و رأينا الخلق بأوصاف البطلة ختمنا عليه و جعلناه بيننا و بين الله و رددناه إليه
কুরআনের আয়াতগুলো এমনভাবে সংযুক্ত করে উপস্থাপন করা যে, সম্পূর্ণ পাঠ্য একটি সুচিন্তিত, সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ রচনারূপে প্রতিভাত হয়—নিঃসন্দেহে এটি একটি মহান জ্ঞানের শাখা। এখন পর্যন্ত কেবল একজনই আছেন যিনি এই বিষয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। তিনি এই দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করে সূরা বাকারাকে একটি সম্পূর্ণ, সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ আলোচনারূপে প্রমাণ করতে সক্ষম হন।
এরপর আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ ও দয়ার মাধ্যমে আমার জন্য এই জ্ঞানের দ্বার খুলে দেন। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম—মানুষ এই জ্ঞানের মূল্য ও মর্যাদা অনুধাবন করে না। আমি দেখলাম, লোকদের দৃষ্টিশক্তি প্রখর নয়, অন্তর্দৃষ্টি দুর্বল। এই অবস্থায় আমাকে বাধ্য হয়ে এই দরজাকে আবার বন্ধ করে রাখতে হয় এবং এই বিষয়টিকে আল্লাহর সঙ্গে আমার মধ্যকার এক নিভৃত ব্যাপার হিসেবেই রেখে দিই।
এই মহান জ্ঞানের জন্য ইমাম রাজীও তার তাফসিরে বারবার আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছেন। মখদুম মহাআইমী (রহ.)-এর কুরআন ব্যাখ্যামূলক রচনাটিও প্রধানত আয়াতসমূহের আন্তঃসম্পর্ক বা পরস্পরের সংগতি ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। এর জন্য তিনি গভীরভাবে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং তার নিজের অক্ষমতাও আন্তরিকভাবে স্বীকার করেছেন। তিনি এই জ্ঞানকে একান্তই তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ বলে মনে করেছেন এবং নিজের অবদান বা যোগ্যতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। আমি মনে করি, এমন গভীর কৃতজ্ঞতা ও বিনয়বোধ থেকেই তিনি তার তাফসিরের নাম রেখেছেন—”তাবসীরুর রাহমান ও তাসীরুল মান্নান” (রহমানের প্রদত্ত অন্তর্দৃষ্টি এবং দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজীকরণ)।
উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যারা কুরআনের আয়াতসমূহের যোগসূত্র ও গঠনগত সৌন্দর্যের জ্ঞান লাভ করেছেন, তারা এই জ্ঞানের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন। তাদের এই স্বীকারোক্তি হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত। কারণ তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন কুরআনের আয়াতসমূহ এক অত্যাশ্চর্য বিন্যাসে গঠিত।
এ বিষয়ে শায়খ ওয়ালীউদ্দীন মালাওয়ী বলেছেন,
قد وهم من قال لا يطلب للآي الكريمة مناسبة لأنها على حسب الوقائع المفرقة و فصل الخطاب أنها على حسب الوقائع تنزيلا و على حسب الحكمة ترتيبا
যারা বলেন, পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ খোঁজার প্রয়াস অনুচিত। কারণ এসব আয়াত নাজিল হয়েছে বিচিত্র ও ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, তারা একেবারেই ভুল করছেন। প্রকৃত সত্য হলো, যদিও আয়াতগুলো বিভিন্ন প্রসঙ্গে ও অবস্থায় নাজিল হয়েছে, তবুও আল্লাহর পরিপূর্ণ হিকমতের আলোকে সেগুলোকে কুরআনের বর্তমান বিন্যাসে এমনভাবে সাজানো হয়েছে—যাতে একটি সুবিন্যস্ত, সংগঠিত ও গভীর তাৎপর্যময় রচনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায়।
পবিত্র কুরআনের সূক্ষ্ম বিন্যাসের সুগন্ধ অনুভব করা, তার সৌন্দর্যকে চোখে দেখা এবং মন দিয়ে অনুভব করার এই সত্য বিজ্ঞ পাঠক অস্বীকার করতে পারে না। তবে যারা মনে করেন কুরআন গোছানো গ্রন্থ নয়, শুধুমাত্র এ কারণে তাদের দোষ দেওয়া যায় না যে, তারা এখনও কুরআনের নাজম উপলব্ধি করতে পারেনি। আমি যা আলেমদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই, তার জন্য এত বিশদ ও দীর্ঘ আলোচনা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল না। তবুও কুরআনের যোগসূত্র আবিষ্কার করার জন্য গভীর চিন্তাভাবনা জরুরি হওয়ায় আমি এই আলোচনা এতদূর লম্বা করেছি। যদি কেউ মনে করেন এই কিতাবে কোনো নাজরে আলোচনা নেই। তবে তার পক্ষে এই পথচলায় এক পা এগোনোও সম্ভব হবে না। সবকিছু তার কাছে এত অচেনা ও অজানা মনে হবে যে, সে কখনোই গভীরভাবে নিজেকে নিবেদন করতে পারবে না।
তবে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, যদি কুরআনের নাজম এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে কেন নবী (সা.) ও সাহাবাগণ (রা.) এ সম্পর্কে নীরব ছিলেন? কেন নবী (সা.) নিজেই এই গুরুত্বপূর্ণ ঐশ্বরিক বিষয় সম্পর্কে মুসলিমদের বলেননি?
এই প্রশ্নের উত্তর হলো তারা সকলেই পবিত্র কুরআনের আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন।
কুরআনের বাণী তাদের জীবনের সমস্যা ও পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে নাজিল হয়েছিল। যদি আমরা সেই পবিত্র যুগে জীবনযাপন করতাম, তবে কুরআনের যোগসূত্র আমাদের কাছেও স্বচ্ছ হয়ে উঠত। এজন্যই আমরা দেখি যে, সাহাবাগণের কাছে তুলনামূলক কমই তাফসীরমূলক বর্ণনা সংরক্ষিত আছে; কারণ কুরআন তাদের মাতৃভাষায় নাযিল হয়েছিল, তাদের ভাষার শৈলী অনুসরণ করেছিল এবং তাদের সমস্যা ও প্রশ্নগুলোই কোরআনে আলোচিত হয়েছিল। সুতরাং তাহলে কুরআনের যোগসূত্র বোঝার ক্ষেত্রে কীভাবে আমরা তাদের সাথে নিজেদের তুলনা করতে পারি? তবু সাহাবাগণ (রহ.) ও আমাদের মধ্যে কালক্ষেপণের এত বড় ফারাক থাকা সত্ত্বেও, কুরআনের পাঠ্যাংশে, আয়াতের পুনরাবৃত্তি, ভাষণের দৃঢ়তা এবং যুক্তি উপস্থাপনার মধ্যে কিছু নিদর্শন রয়েছে যা আমাদের অনুপস্থিতি ছাড়িয়ে এক গভীর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। এই বিষয়গুলো অবিরত আলোকিত করে এবং প্রতিটি উৎসাহী ও সূক্ষ্মবুদ্ধিসম্পন্ন পাঠককে নাজম উপলব্ধি করতে সহায়তা করে।
এখানে আমি নাজম সম্পর্কিত আলোচনা সমাপ্ত করছি।