(হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর আসার)
ড. আম্মার খান নাসির
[এই অধ্যায়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কিছু নির্বাচিত আসারের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মূল বিষয় হলো: দ্বীন-ধর্মে সাহাবিগণের অনুসরণীয় হওয়া এবং তাদের জ্ঞান ও কর্মে আদর্শ হিসেবে উম্মাহর জন্য পথপ্রদর্শক হওয়া। ইবনে মাসউদ (রা.) প্রাথমিক যুগের একজন শীর্ষস্থানীয় সাহাবি এবং সাহাবিগণের মধ্যে অন্যতম ফকিহ। সাইয়িদুনা উমর (রা.) তার জ্ঞান ও ফিকহের প্রশংসা এভাবে করেছেন: ‘কানিফুন মালিউন ইলমান’ (তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ, নম্বর: ২৩১১), অর্থাৎ একটি ছোট থলে, যা জ্ঞানে পূর্ণ। সাইয়িদুনা উমর (রা.)-এর খিলাফতের সময়ে মুসলিমদের শিক্ষা এবং দ্বীনি পথনির্দেশনার জন্য তাকে কুফায় পাঠানো হয় এবং সাইয়িদুনা উসমান (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম কয়েক বছর তিনি সেখানেই ছিলেন। তারপর তাকে মদিনায় ফেরত ডাকা হয়, যেখানে ৩২ হিজরিতে তার মৃত্যু হয়। কুফা ছিল এমন এক স্থান, যেখানে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন ধারা আবির্ভূত হচ্ছিল এবং যেখানে সাহাবিদের সম্মিলিত ধর্মীয় বোঝাপড়া ও কর্মপন্থা থেকে বিচ্যুতির লক্ষণ দৃশ্যমান ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সাহাবিগণের অনুসরণ ও তাদের পথনির্দেশের গুরুত্ব তুলে ধরা ইবনে মাসউদ (রা.)-এর শিক্ষা ও প্রচারের একটি প্রধান বিষয় ছিল। উপস্থাপিত আসারগুলো থেকে এই বিষয়টির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়।]
(১)
عن زر بن حبيش، عن عبد اللّٰه بن مسعود، قال: إِنَّ اللّٰهَ نَظَرَ فِي قُلُوبِ الْعِبَادِ، فَوَجَدَ قَلْبَ مُحَمَّدٍ صلی اللّٰہ علیه وسلم خَيْرَ قُلُوبِ الْعِبَادِ، فَاصْطَفَاهُ لِنَفْسِهِ، فَابْتَعَثَهُ بِرِسَالَتِهِ، ثُمَّ نَظَرَ فِي قُلُوبِ الْعِبَادِ بَعْدَ قَلْبِ مُحَمَّدٍ، فَوَجَدَ قُلُوبَ أَصْحَابِهِ خَيْرَ قُلُوبِ الْعِبَادِ، فَجَعَلَهُمْ وُزَرَاءَ نَبِيِّهِ، يُقَاتِلُونَ عَلَى دِينِهِ، فَمَا رَأَى الْمُسْلِمُونَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللّٰهِ حَسَنٌ، وَمَا رَأَوْا سَيِّئًا فَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ سَيِّئٌ.
“যির ইবনে হুবাইশ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন: আল্লাহতায়ালা বান্দাদের হৃদয়ের অবস্থা পরখ করেছেন, তারপর মুহাম্মদ (সা.)-এর হৃদয়কে বান্দাদের হৃদয়ের মধ্যে সর্বোত্তম হিসেবে পেয়ে তাকে নিজের জন্য নির্বাচিত করেছেন এবং তাকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন। তারপর মুহাম্মদ (সা.)-এর হৃদয়ের পর বান্দাদের হৃদয়ের অবস্থা আবার পরখ করেন এবং তার সাহাবিদের হৃদয়কে বান্দাদের হৃদয়ের মধ্যে সেরা হিসেবে পেয়ে তাদেরকে তার নবীর সাহায্যকারী নিযুক্ত করেন, যারা তার ধর্মের জন্য যুদ্ধ করেন। অতএব, মুমিনগণ (অর্থাৎ সাহাবিগণ) যেটা ভালো মনে করেন, তা আল্লাহর কাছে ভালো এবং যেটা তারা খারাপ মনে করেন, তা আল্লাহর কাছে খারাপ। ” (মুসনাদে আহমাদ: ৩৪৬৮)
ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ:
১. মৌলিক বিষয়বস্তুর দিক থেকে এই আসারটি নবী (সা.)-এর এই বিখ্যাত বাণীর বিস্তারিত ব্যাখ্যা: إِنَّ اللّٰه تَبَارَك وَتَعَالَىٰ اخْتَارَنِي وَاخْتَارَ بِي أَصْحَابًا — “আল্লাহতায়ালা আমাকে নির্বাচিত করেছেন এবং আমার সাথে আমার সাহাবিদেরও নির্বাচিত করেছেন। ” (মুস্তাদরাক হাকিম, ৬৭৩২)
এই আসার থেকে স্পষ্ট যে, নবীদের ও তাদের সাথি ও সহযোগীদেরকে তাদের হৃদয়ের অবস্থা অর্থাৎ তাকওয়া, সত্যপ্রেম ও সততার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়।
২. শেষোক্ত বাক্য থেকে স্পষ্ট যে, এর পটভূমি ছিল: সাহাবিগণের কিছু সম্মিলিত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে যে সন্দেহ ও সংশয় ছিল, তা দূর করা। অর্থাৎ যাদেরকে আল্লাহ তাদের হৃদয়ের অবস্থা দেখে তাঁর নবী (সা.)-এর সহায়তার জন্য নির্বাচিত করেছেন, তাদের ধর্মীয় জ্ঞান আল্লাহর কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং তাদের করা সিদ্ধান্তসমূহ আল্লাহর ইচ্ছার বিরোধী হতে পারে না। যদি এই গোষ্ঠী কোনো সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার সঠিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা বা তা নিয়ে নিন্দা ও আপত্তি তোলা ধর্মীয়ভাবে সঠিক নয়। আসারের বর্ণনাকারী আবু বাকর ইবনে আয়াশের যে মন্তব্য উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, তা থেকেও একই বিষয় স্পষ্ট হয়।
৩. এই আসারের প্রেক্ষাপট থেকে স্পষ্ট যে, এখানে বিশেষভাবে সাহাবিদের সমষ্টিগত সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। ফকিহদের মধ্যে অনেকেই এই আসারের শেষ বাক্য مَا رَأَى الْمُسْلِمُونَ حَسَنًا فَهُوَ عِندَ اللّٰهِ حَسَنٌ (মুসলিমরা যা ভালো মনে করবে, তা আল্লাহর কাছে ভালো হবে) থেকে ফিকহি বিষয়গুলিতে প্রথা বা ঐতিহ্যের গুরুত্বকে প্রমাণের জন্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন (কুদুরি, তাজরিদ, ৬/৩০৩৫; বদরুদ্দিন আইনি আল-হানাফির আল-বিনায়াহ শারহ আল-হিদায়াহ, ১০/২৭৬)
প্রথার গ্রহণযোগ্যতা একটি ফিকহি নিয়ম হিসেবে তার জায়গায় সঠিক হতে পারে, তবে এখানে ইবনে মাসউদ (রা.)-এর উদ্দেশ্য কোনো ফিকহি নিয়মের ব্যাখ্যা করা নয়। একইভাবে এই আসারটি সাধারণ মুসলমানদের গৃহীত অনেক বিদআত (নতুন উদ্ভাবিত ধর্মীয় আচরণ)-এর বৈধ হওয়ার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয় এবং মনে করা হয় যে, ধর্মীয়ভাবে যেকোন বিষয় যদি সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ও প্রচলন লাভ করে, তবে সেটা শরিয়ত অনুমোদিত। স্পষ্টত এখান থেকে এই কথা গ্রহণ করা বক্তব্যের উদ্দেশ্যের সাথে মানানসই নয়।
উৎসগ্রন্থ এবং পৃথক পৃথক সূত্র
ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এই আসারটি মুসনাদে আহমাদ ছাড়াও নিম্নলিখিত উৎসগুলোতে বর্ণিত হয়েছে:
তাবরানি, المعجم الکبیر, নম্বর: ৮৪৯৭।
المعجم الاوسط, নম্বর: ৩৬৮৬।
আল-আজুরি, الشریعۃ, নম্বর: ১১৪৬।
আহমদ ইবনে হাম্বল, فضائل الصحابۃ, নম্বর: ৫১৭।
معجم ابن الاعرابی, নম্বর: ৮৪৩।
এই আসারটি ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দুই শিষ্য, যির ইবনে হুবাইশ এবং আবু ওয়াইল শাকিক ইবনে সালমা বর্ণনা করেছেন এবং তাদের উভয়ের সূত্রে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। আবু ওয়াইলের বর্ণনায় وَابْتَعَثَهُ بِرِسَالَتِهِ-এর পরিবর্তে وَانْتَخَبَهُ بِعِلْمِهِ শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে, فَجَعَلَهُمْ وُزَرَاءَ نَبِيِّهِ يُقَاتِلُونَ عَلَى دِينِهِ-এর পরিবর্তে فَاخْتَارَ لَهُ أَصْحَابَهُ فَجَعَلَهُمْ أَنْصَارَ دِينِهِ وَوُزَرَاءَ نَبِيِّهِ ব্যবহৃত হয়েছে। এক সূত্রে শেষের বাক্যে وَمَا رَآهُ الْمُؤْمِنُونَ سَيِّئًا فَهُوَ عِندَ اللَّهِ سَيِّئٌ-এর পরিবর্তে وَمَا رَأَوْهُ قَبِيحًا فَهُوَ عِندَ اللّٰهِ قَبِيحٌ ব্যবহৃত হয়েছে। (বাইহাকি, মাদখাল ইলা সুনানি কুবরা, নম্বর: ২৫)। আহমাদ ইবনে হাম্বলের ফাযায়েলে সাহাবার বর্ণনাটি এরকম: “নবী (সা.)-এর সাহাবিগণ একমত হয়েছিলেন যে, আবু বকর (রা.)-কে খলিফা হিসেবে নিয়োগ করা হবে।”
তবে অন্যান্য সূত্র থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই কথাটি ইবনে মাসউদ (রা.)-এর নয়, বরং হাদিসের বর্ণনাকারী আবু বকর ইবনে আইয়াশ-এর মন্তব্য ছিল। ইবনুল আরাবির বর্ণনায় বলা হয়েছে: “আমি আবু বকর ইবনে আইয়াশ বলছি, সাহাবিগণ (রা.) রাসুল (সা.)-এর পর খলিফা হিসেবে আবু বকর (রা.)-কে দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।” (মুজামু ইবনিল আরাবি, নম্বর: ৮৪৩)
(২)
عن قتادة قال: قال ابن مسعود رضي اللّٰه عنه: مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مُتَأَسِّيًا فَلْيَتَأَسَّ بِأَصْحَابِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِنَّهُمْ كَانُوا أَبَرَّ هَذِهِ الْأُمَّةِ قُلُوبًا وَأَعْمَقَهَا عِلْمًا وَأَقَلَّهَا تَكَلُّفًا وَأَقْوَمَهَا هَدْيًا وَأَحْسَنَهَا حَالًا، قَوْمًا اخْتَارَهُمُ اللّٰهُ تَعَالَى لِصُحْبَةِ نَبِيِّهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاعْرِفُوا لَهُمْ فَضْلَهُمْ وَاتَّبِعُوهُمْ فِي آثَارِهِمْ، فَإِنَّهُمْ كَانُوا عَلَى الْهُدَى الْمُسْتَقِيم
“কাতাদাহ (রহ.) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বলেছেন: তোমাদের মধ্যে যে কেউ কাউকে অনুসরণ করতে চায়, সে যেন মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবিদের অনুসরণ করে। এই উম্মতের মধ্যে তাদের অন্তর সবচেয়ে বেশি পূণ্যে পরিপূর্ণ ছিল, তাদের জ্ঞান ছিল সবচেয়ে গভীর, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম কৃত্রিমতা ছিল, তাদের জীবনাচরণ ছিল সবচেয়ে সরল এবং তাদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে ভালো। তারা ছিল এমন দল, যাদের আল্লাহ তাঁর নবীর সঙ্গী হওয়ার জন্য নির্বাচন করেছেন। সুতরাং তাদের মর্যাদা বুঝ এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো, কারণ তারা সরল পথেই ছিলেন।’’ (আল-জামি ফি বায়ানিল ইলমি ওয়া-ফাদলিহি, ইবনু আবদিল বার, নম্বর: ১১১৭)
আভিধানিক বিশ্লেষণ
فَلْيَتَأَسَّ بِأَصْحَابِ مُحَمَّدٍ :فلیتأس শব্দটি أسوۃ থেকে এসেছে, যার মানে হলো একটি আদর্শ বা নমুনা, যা অনুসরণ করা উচিত। تأسی بفلان মানে হলো, কাউকে অনুসরণ করা এবং তার পদ্ধতি বা আদর্শ অনুসরণ করা।
فَلْيَسْتَنَّ بِمَنْ قَدْ مَاتَ: فلیستن শব্দটি سنة থেকে এসেছে, যার মানে হলো কাউকে অনুসরণ করা, তার পদ্ধতি গ্রহণ করা।
أَبَرَّهَا قُلُوبًا: أَبَرّ, بَرٌّ থেকে একটি اسم تفضیل (তুলনামূলক আধিক্যবোধক বিশেষণ) এসেছে, যার অর্থ হলো পূণ্যবান। أبرها قلوبًا-এর মানে হলো, যাদের অন্তর সবচেয়ে বেশি পূণ্যে পরিপূর্ণ।
ব্যাখ্যা
১. এই আসারটির প্রেক্ষাপট থেকে স্পষ্ট যে, ইবনু মাসউদ (রা.) শ্রোতাদের কাছে ধর্মীয় ক্ষেত্রে বড় সাহাবিদের অনুসরণীয় হিসেবে গ্রহণের গুরুত্ব জানাতে চেয়েছিলেন। এই বিষয়ে তিনি সাহাবিদের শ্রেষ্ঠত্বের নানা দিক তুলে ধরেছেন:
প্রথমত: তাদের অন্তর পূণ্য, তাকওয়া ও আল্লাহভীরুতায় পূর্ণ ছিল।
দ্বিতীয়ত: তাদের জ্ঞান অনেক গভীর ছিল এবং তারা দ্বীনের মেজাজ ও প্রকৃতি এবং এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানতেন।
তৃতীয়ত: তাদের মধ্যে জ্ঞান ও কর্ম দুটোই তার প্রাকৃতিক রূপে ছিল এবং তাদের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা বা লৌকিকতা ছিল না।
চতুর্থত: তারা তাদের চরিত্র ও জীবনাচারে অবিচলতা ও ভারসাম্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন।
পঞ্চমত: ধর্মীয় অবস্থার দিক থেকে তারা শ্রেষ্ঠ লোক ছিলেন।
এই গুণাবলির কারণে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে নবী (সা.)-এর সঙ্গ ও সাহচর্য লাভের জন্য নির্বাচিত করেছেন এবং এই গুণগুলোর কারণেই তারা এই যোগ্যতা লাভ করেছেন যে, পরবর্তীতে আসা মানুষরা তাদের পথ অনুসরণ ও তাদের মতো জীবনাচার গ্রহণকে হেদায়েত লাভের মাধ্যম মনে করবে।
২. মিশকাতে বর্ণিত সূত্রে আসারটির প্রথম বাক্য এভাবে বর্ণিত হয়েছে: مَنْ كَانَ مُسْتَنًّا فَلْيَسْتَنَّ بِمَنْ قَدْ مَاتَ، فَإِنَّ الْحَيَّ لَا تُؤْمَنُ عَلَيْهِ الْفِتْنَةُ। তবে যেটা মনে হয়, বর্ণনাকারী এই শব্দগুলো ইবনু মাসউদ (রা.)-এর আরেকটি বাণী থেকে এই আসারের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যেখানে ইবনু মাসউদ (রা.) অনুসরণ করার জন্য মৃত ব্যক্তিদের বেছে নেয়ার ব্যাপারে অন্য একটি দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেছেন। আবদাহ বিন আবি লুবাবাহ বর্ণনা করেন যে, ইবনু মাসউদ (রা.) বলেছেন:
أَلا لا يُقَلِّدَنَّ رَجُلٌ رَجُلاً دِينَهُ، فَإِنْ آمَنَ آمَنَ، وَإِنْ كَفَرَ كَفَرَ، فَإِنْ كَانَ مُقَلِّدًا لا مَحَالَةَ فَلْيُقَلِّدِ الْمَيِّتَ، وَيَتْرُكَ الْحَيَّ، فَإِنَّ الْحَيَّ لا تُؤْمَنُ عَلَيْهِ الْفِتْنَةُ.
“সতর্ক থাকো, কোনো ব্যক্তি যেন তার ধর্মকে অপর কোনো ব্যক্তির সাথে এমনভাবে যুক্ত না করে যে, যদি সে ঈমান আনে, তাহলে সেও ঈমান আনবে, আর যদি ঐ ব্যক্তি কুফরি করে, তাহলে সেও কুফরি করবে। যদি কাউকে কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতেই হয়, তবে তাকে জীবিতদের ছেড়ে মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। কারণ জীবিত ব্যক্তি ফিতনা থেকে মুক্ত নয়।” (বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, নম্বর: ১৮৭২৪)
এটা একটি আলাদা বিষয় এবং এর উদ্দেশ্য হলো: ধর্মের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস স্থাপনের ব্যাপারে সতর্ক করা। এদিকে আলোচ্য আসারে ইবনু মাসউদ (রা.) সাহাবিদের অনুসরণ এবং তাদের পথ অনুসরণ করার নির্দেশনা প্রদান করছেন।
উৎসগ্রন্থ এবং সূত্রের ভিন্নতা
কাতাদার সনদে ইবনু আবদিল বারের পাশাপাশি খতিব বাগদাদি (তালখিসুল মুতাশাবিহ ফির রাসম, নম্বর: ৬৬৮) এবং রযিনের সূত্রে মিশকাত গ্রন্থকার (নম্বর: ১৯৩) আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.)-এর আসারটি বর্ণনা করেছেন। এই তিনটি বর্ণনার মধ্যে মূল পাঠে যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলি রয়েছে, তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
খতিবের বর্ণনায় مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مُتَأَسِّيًا فَلْيَتَأَسَّ بِأَصْحَابِ مُحَمَّدٍ-এর পরিবর্তে مَنْ كَانَ مُسْتَنًّا فَلْيَسْتَنَّ بِمَنْ قَدْ مَاتَ، أُولَئِكَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ এই শব্দগুলি বর্ণিত হয়েছে। মিশকাতে বর্ণিত সূত্রে বাক্যটি এভাবে এসেছে: مَنْ كَانَ مُسْتَنًّا فَلْيَسْتَنَّ بِمَنْ قَدْ مَاتَ، فَإِنَّ الْحَيَّ لَا تُؤْمَنُ عَلَيْهِ الْفِتْنَةُ।
অর্থাৎ “যে কাউকে অনুসরণ করতে চায়, সে তাদের অনুসরণ করুক যারা মারা গেছেন, কারণ জীবিত ব্যক্তি ফিতনা থেকে মুক্ত নয়।”
খতিব এবং মিশকাতের বর্ণনায় اخْتَارَهُمُ اللّٰهُ لِصُحْبَةِ نَبِيِّهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ-এর পরে وَإِقَامَةِ دِينِهِ এই শব্দগুলি অতিরিক্ত যুক্ত হয়েছে।
খতিবের বর্ণনায় وَاتَّبِعُوهُمْ فِي أَثَرِهِمْ-এর পরে وَتَمَسَّكُوا بِمَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ أَخْلاقِهِمْ وَدِينِهِمْ শব্দগুলি এবং মিশকাতের বর্ণনায় من أخلاقھم وسیرھم এই শব্দগুলি অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে (তালখিসুল মুতাশাবিহ ফির রাসম, নম্বর ৬৬৮), অর্থাৎ “যতটুকু সম্ভব, তাদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় আচরণ অনুসরণ করো।”
ইবনু মাসউদ (রা.)-এর পাশাপাশি এই বিষয়টি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) ও হাসান বাসরি (রহ.)-এর বক্তব্য হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। ইবনু উমরের আসার আবু নুয়াইম কিছু শব্দের পার্থক্যসহ বর্ণনা করেছেন। যেমন, এতে وَإِقَامَةِ دِينِهِ-এর পরিবর্তে وَنَقْلِ دِينِهِ এবং وَتَمَسَّكُوا بِمَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ أَخْلاقِهِمْ وَدِينِهِمْ-এর পরিবর্তে فَتَشَبَّهُوا بِأَخْلاقِهِمْ وَطَرَائِقِهِمْ এই শব্দগুলি এসেছে। (আবু নুয়াইম, হিলয়াতুল আউলিয়া, নম্বর ১০৯৭)।
হাসান বাসরি (রহ.)-এর বক্তব্য হিসেবে আজুরি ও ইবনু আবদিল বার এটা বর্ণনা করেছেন। এতে শেষ বাক্যটি এভাবে এসেছে: فَتَشَبَّهُوا بِأَخْلَاقِهِمْ وَطَرَائِقِهِمْ فَإِنَّهُمْ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ عَلَى الْهَدْيِ الْمُسْتَقِيمِ। অর্থাৎ “তাদের মতো নৈতিকতা এবং তাদের মতো পদ্ধতি গ্রহণ করো, কারণ কাবার প্রভুর শপথ, তারা সঠিক পথেই আছেন। ” (আল-আজুরি, আশ-শারিয়া, নম্বর ১৯৮৪; আল-জামি ফি বাইয়ানি ইলমি ওয়া ফাদলিহি, নম্বর ১১১৭)