বিষয়বস্তুতে যান

ইসলামে জ্ঞান ও যুক্তির মৌলিক নীতিমালা

সৈয়দ মনজুরুল হাসান বাংলা

ইসলামে আলোচনার ক্ষেত্রে জ্ঞান ও যুক্তির জন্য দুটি নীতিকে মৌলিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো বুদ্ধি ও বর্ণনার মৌলিক ভিত্তি, যা গ্রহণ করা ছাড়া দ্বীন ও শরিয়তের সঠিক উপলব্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। এই নীতিগুলো নিম্নরূপ:

প্রথমত, ইসলামে কুরআন মাজিদের মর্যাদা হলো মিজান ও ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী)। এর অর্থ হলো, দ্বীন সম্পর্কিত সমস্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মানদণ্ড হলো পবিত্র কুরআন।

তাই হাদিস ও আসার, ইতিহাস ও সিরাত, ফিকহ ও তাফসিরের প্রত্যেক মতামত, প্রতিটি বর্ণনা ও সব বক্তব্যকে এর মানদণ্ডে ও কষ্টিপাথরে যাচাই করা হবে। যা কুরআন মঞ্জুর করবে, কেবল সেটাই গ্রহণযোগ্য হবে। আর যা কুরআন প্রত্যাখ্যান করবে, তাকে দ্বীন বা তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হবে না।

এই নীতির বাস্তবায়নের জন্য এটা অপরিহার্য যে, হাদিসকে কুরআনের আলোকে বোঝা হবে এবং যদি সেখানে কোনো কিছু কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা উচিত হবে না।

‘মিজান’-এ বলা হয়েছে: “… ধর্মে কুরআনের মর্যাদা হলো মিজান (মানদণ্ড) ও ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী)। কুরআন সমস্ত বিষয়ের উপর নজরদারি রাখে এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য একে বিচারক হিসেবে অবতীর্ণ করা হয়েছে, সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যদি কোনো কিছু কুরআনের বিপরীত হয়, তবে তা অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করা উচিত। …

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার নবুয়ত ও রিসালতের মর্যাদায় যা কিছু করেছেন, সেই ইতিহাসের চূড়ান্ত উৎসও কুরআন। অতএব, হাদিসের অধিকাংশ বিষয় কুরআনের সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্কিত, যেমন একটি বস্তুর শাখা তার মূলের সঙ্গে এবং একটি ব্যাখ্যা তার মূল বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। মূল বক্তব্য না দেখে তার ব্যাখ্যা অনুধাবন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। হাদিস অনুধাবনের ক্ষেত্রে এই পর্যন্ত যতগুলো ভুল হয়েছে, সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে সেগুলোর পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়। রিসালতের সময়ে রজমের ঘটনাবলি, কাব ইবন আশরাফকে হত্যা, কবরে শাস্তি এবং শাফায়াতের বর্ণনা, ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে যেন আমি এই মানুষদের সাথে যুদ্ধ করি’ (বুখারি, হাদিস নং: ২৫, মুসলিম, হাদিস নং: ১২৯) এবং ‘যে ব্যক্তি তার ধর্ম পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো।’ (বুখারি, হাদিস নং: ৩০১৭) — এই জাতীয় বিষয়গুলো নিয়ে দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টি হওয়ার একমাত্র কারণ হলো: কুরআনের মধ্যে থাকা মূল বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে এগুলোকে বোঝার চেষ্টা করা হয়নি।” (মিজান, পৃষ্ঠা: ৬৩-৬৫)

দ্বিতীয়ত, কুরআন মাজিদ স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। এর শব্দ ও শৈলীতে কোনো অস্পষ্টতা, দ্বিধা বা সংশয় নেই। অপ্রচলিত বা অপরিচিত কোনো শব্দ বা শৈলী এতে ব্যবহৃত হয়নি। এটা তার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ স্পষ্টতার সঙ্গে উপস্থাপন করে, যা জ্ঞানীদের জন্য বোঝার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করে না। ‘মিজান’-এ বলা হয়েছে:

“কুরআন কেবল আরবিতে নয়, বরং আরবি মুবিনে (প্রাঞ্জল আরবি ভাষায়) অবতীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ এমন একটি ভাষায় যা অত্যন্ত পরিষ্কার, যাতে কোনো প্রকার অস্পষ্টতা নেই, যার প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট এবং যার প্রতিটি শৈলী তার শ্রোতাদের জন্য পরিচিত ও সহজবোধ্য। আল্লাহ বলেন:

এটা রুহুল আমিন (জিব্রাইল) নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন, আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি অন্যান্য নবীর মতো সতর্ককারী হতে পারেন। এটা অত্যন্ত প্রাঞ্জল আরবি ভাষায়। (সুরা শুআরা: ১৯৩-১৯৫)

এমন একটি কুরআনের রূপে, যা আরবি ভাষায় উপস্থাপিত, যার মধ্যে কোনো প্রকার বক্রতা নেই, যেন তারা আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে। (সুরা যুমার: ২৮)

কুরআন সম্পর্কে এটা একটি স্পষ্ট সত্য যে, একে যদি আপনি মেনে নেন, তবে এর অপরিহার্য দাবি হিসেবে এটা মেনে নিতে হবে যে, কুরআনের কোনো শব্দ বা শৈলী তার অর্থের দিক থেকে অস্বাভাবিক বা বিরল হতে পারে না। এটা এমন শব্দ ও শৈলীতে নাজিল হয়েছে, যা তার শ্রোতাদের জন্য সম্পূর্ণ পরিচিত। ভাষার দিক থেকে এর মধ্যে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা নেই, বরং সব দিক থেকে পরিষ্কার ও স্পষ্ট। অতএব, এর অনুবাদ ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে প্রতিটি স্থানে এর শব্দের পরিচিত অর্থই বিবেচনায় নিতে হবে। এর বাইরে এর কোনো ব্যাখ্যা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।” (মিজান, পৃষ্ঠা: ২১-২০)

আমাদের দৃষ্টিতে, প্রচলিত মতবাদ ও চিন্তাধারার অধিকাংশ ভুল বোঝাবুঝির কারণ হলো গবেষণা ও বর্ণনার এই মূলনীতিগুলোর প্রতি উদাসীনতা। ফলস্বরূপ, নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত ও দ্ব্যর্থহীন কুরআনের আয়াতসমূহকে উপেক্ষা করা হয় এবং সম্ভাব্য প্রমাণিত ও দ্ব্যর্থবোধক হাদিসকে মূল হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

হাদিসগুলোকে কুরআনের আলোকে বোঝার পরিবর্তে, কুরআনকে হাদিসগুলোর আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। আরবি ভাষার পরিচিত শব্দ ও শৈলীর ক্ষেত্রেও এমনটি হয়। সেগুলোকে প্রচলিত অর্থ থেকে সরিয়ে অস্বাভাবিক ও অপরিচিত অর্থ গ্রহণ করা হয়। জ্ঞান ও গবেষণার এই ভুল দৃষ্টিভঙ্গি এবং বোধ ও যুক্তি উপস্থাপনের এই উল্টো পদ্ধতির দ্বারা কুরআনের মানদণ্ড ও কষ্ঠিপাথর হওয়ার অবস্থান আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ভাষা ও মনের ভাব প্রকাশের স্বীকৃত নীতিগুলো উপেক্ষিত হয় এবং কখনো কখনো এমন একটি মর্ম উদ্ধার করা হয়, যা কোনো কোনো দিক থেকে কুরআন ও হাদিস দুটোরই মূলভাবের বিপরীত।