বিষয়বস্তুতে যান

প্রাণীর ছবি ও ভাস্কর্য নির্মাণ করা কি ইসলামে হারাম?

বাংলা

সাধারণভাবে মুসলিমরা মনে করে প্রাণীর ছবি এবং ভাস্কর্য নির্মাণ করা ইসলামে হারাম। যদিও পবিত্র কুরআনে সরাসরি প্রাণীর ছবি বা ভাস্কর্য নির্মাণ করাকে হারাম বলা হয়নি। তবে বেশ কিছু হাদিসের মধ্যে এ বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে। আমাদের মতে প্রাণীর ছবি এবং ভাস্কর্য নির্মাণ করা হারাম নয়। যেহেতু কুরআনে সরাসরি নিষেধ করা হয়নি, সুতরাং হাদিসের নিষেধাজ্ঞাগুলো যথার্থ মূল্যায়ন করার অপরিহার্য। আজকের এই প্রবন্ধে কুরআন, সুন্নাহ এবং হাদিসের যথার্থ মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা জানার চেষ্টা করব ইসলামে কেন প্রাণীর ছবি এবং ভাস্কর্য নির্মাণ করা হারাম নয়।

হারাম ও হালালের বিধান

পৃথিবীতে হারামের সংখ্যা খুবই সীমিত। তাই কোন কাজ হারাম এ সম্পর্কে কুরআনে স্পষ্ট তালিকা দেয়া হয়েছে। এই তালিকাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত আল্লাহ কর্মগত হারাম কাজের তালিকা দিয়েছেন, দ্বিতীয়ত পানাহারের বস্তুর মধ্যে কোনগুলো হারাম তার তালিকা দেয়া হয়েছে। যেহেতু এই প্রবন্ধে আমরা হারাম ও হালালের মূলনীতি সম্পর্কে আলোচনা করছি না, তাই আমি শুধুমাত্র কর্মগত হারাম কাজের মূলনীতিগুলো নিচে উল্লেখ করছি।

এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে

বলুন, আমার প্রভু শুধু এই কাজগুলোই হারাম করেছেন; প্রকাশ্য ও গোপন সবধরনের অশ্লীলতা, অধিকার হরণ, অন্যায় সীমালঙ্ঘন, আল্লাহর সাথে তোমাদের এমন কিছু শরিক করা যার ব্যাপারে তিনি কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি আর আল্লাহর নামে মিথ্যা রটিয়ে এমন কথা বলা যা তোমরা জানো না। (সূরা আরাফ: ৩৩)

উল্লেখ্য যে, হারামের মূলনীতি হিসেবে এই আয়াত বর্ণনা করার আগে আল্লাহ ঈমানদারদের সম্বোধন করে জিজ্ঞেস করেছেন,

আপনি তাদেরকে বলুন, আল্লাহর দেয়া ওই সাজ-সজ্জা কে হারাম করল যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পাক-পবিত্র খাবারগুলোই বা কে নিষিদ্ধ করল? বলুন, এগুলো দুনিয়ার জীবনেও (মূলত) ঈমানদারদের জন্য (যদিও তাতে অস্বীকারকারীরা ভাগ পাচ্ছে) কিন্তু কিয়ামতের দিন এগুলো তাদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। এভাবেই আমি আমার আয়াতগুলো ওই লোকদের জন্য সবিস্তারে বর্ণনা করি যারা জানতে চায়। ( (সূরা আরাফ: ৩২)

চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য সাজ-সজ্জা বা সৌন্দর্য বর্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কুরআনে হযরত সুলাইমান (আ)-এর দরবারের ভাস্কর্যের প্রশংসা করা হয়েছে। সামনে এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব। যাইহোক, সূরা আরাফের ৩৩ নম্বর আয়াতে হারামের যে মূলনীতিগুলো বর্ণনা করা হয়েছে, কোনো চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্য যদি এই মূলনীতির আওতায় পড়ে তাহলে সেটি হারাম হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যথায় সাধারণভাবে প্রাণীর ছবি বা ভাস্কর্য নির্মাণ করা ইসলামে হারাম নয়।

কুরআনের দৃষ্টিতে প্রাণীর ছবি ও ভাস্কর্য

কুরআনে মূর্তি বা ভাস্কর্যের বিষয় আমরা দুই ধরনের আয়াত দেখতে পাই। প্রথমত আল্লাহ পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত মূর্তির নিন্দা করেছেন, দ্বিতীয়ত সাজ-সজ্জা বা সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্দেশ্যে নির্মিত মূর্তি বা ভাস্কর্যের নিরব প্রশংসা করেছেন।

পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত মূর্তির নিন্দা করে কুরআনে বলা হয়েছে,

যখন তিনি তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের বললেন: এই মূর্তিগুলো কী, যেগুলোর সাথে তোমরা জুড়ে রয়েছ? তারা উত্তর দিল: আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এদের উপাসনা করতে দেখেছি।তিনি বললেন: বাস্তবতা হলো, তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা একটি সুস্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ। (সূরা আম্বিয়া: ৫২-৫৪)

সাজ-সজ্জা বা সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্দেশ্যে নির্মিত ভাস্কর্যের বিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছে,

তারা তাঁর জন্য তিনি যা চাইতেন নির্মাণ করে দিত— খিলান, ভাস্কর্য, বড় বড় হাউজের মতো থালা এবং চুলার উপরে বসে থাকা বড় বড় ডেগ, এসব কিছুই। দাউদের পরিবার, (তেমাদের প্রভুর প্রতি) কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে যাও। বাস্তবতা হলো, আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক লোকই কৃতজ্ঞ হয়। (সুরা সাবা: ১৩)

উল্লেখ্য যে, সূরা আম্বিয়া এবং সাবার উভয় আয়াতেই মূর্তি বা ভাস্কর্য বোঝাতে কুরআনে “تماثيل” (তামাসীল) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। “তামাসিল” শব্দটি “তমসীল”-এর বহুবচন। লিসানুল আরাব গ্রন্থে “তমসীল” শব্দের অর্থ করা হয়েছে; এমন প্রতিটি কৃত্রিম বস্তু যা আল্লাহর সৃষ্ট কোনো কিছুর সদৃশ বানানো হয়, তা জীবন্ত হোক বা জড়। কাশশাফ গ্রন্থের রচয়িতা ইমাম জমাখশরী (রহ) এই শব্দের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তমসীল হলো প্রতিটি মূর্তি বা চিত্র যা অন্য কোনো বস্তুর অবয়ব অনুসরণ করে বানানো হয়, তা প্রাণী হোক বা জড়। কুরআনের এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি, চিত্র অংকন, মূর্তি বা ভাস্কর্য কুরআনে এজন্য হারাম করা হয়েছে; কারণ এগুলো পূজার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়াও ইসলামে প্রাণীর ছবি ও মূর্তি নির্মাণ করা হারাম নয়।

হাদিসের দৃষ্টিতে প্রাণীর ছবি ও ভাস্কর্য

আমাদেরকে কুরআনের আলোকে হাদীস বুঝতে হবে। কারণ হাদিস কখনোই স্বতন্ত্রভাবে শরীয়তের বিধান জারি করতে পারে না। কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে যে বিধানগুলো দেয়া হয়েছে, হাদিস মূলত সেই বিধানগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে। সুতরাং প্রাণীর ছবি বা মূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে হাদিসের মধ্যে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা মূলত কুরআনে বর্ণিত হারামের মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কুরআনে যেভাবে পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত মূর্তির নিন্দা করা হয়েছে এবং সাজ-সজ্জার উদ্দেশ্যে নির্মিত মূর্তির নিরব প্রশংসা করা হয়েছে; একইভাবে হাদিসের মধ্যে ঐ সকল মূর্তি বা ছবির নিন্দা করা হয়েছে যা পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয় এবং কুরআনে বর্ণিত হারামের মূলনীতির আওতার মধ্যে পড়ে।

চিত্রাংকন এবং ভাস্কর্য নির্মাণের বিষয়ে যতগুলো হাদিস রয়েছে সেগুলোকে মোট পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা যায়।

১. চিত্র অঙ্কন কারীদের বিষয়ে অভিশাপ

কিছু হাদিসের মধ্যে আমরা দেখতে পাই রাসুল (স) চিত্র অঙ্কন কারীদের অভিশাপ দিয়েছেন। এইগুলো যথাক্রমে সহিহ বুখারি: ২০৮৬, ৫৯৫১, ৫৯৬৩ এবং সহিহ মুসলিম ২১০৭ নাম্বার হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুল (স) বলেছেন, নিশ্চয় কিয়ামতের দিনে সবচেয়ে কঠিন শাস্তির মধ্যে পড়বে চিত্রশিল্পীরা।

আমরা যদি এই হাদিসগুলোকে আক্ষরিক অর্থে মেনে নিয়ে সব ধরনের চিত্রশিল্পীদের অভিশপ্ত মনে করি; তাহলে এটি পবিত্র কুরআন এবং বেশ কিছু সহিহ হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক হবে। কেননা আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি কুরআনে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ছবি বা ভাস্কর্য নির্মাণ করা হারাম করা হয়নি। একইভাবে বেশ কিছু হাদিসের মধ্যে আমরা পরবর্তীতে দেখতে পাবো পর্দা বা কাপড়ের উপর নির্মিত ছবি রাসুল (স) হারাম করেননি। সুতরাং স্পষ্টভাবেই আমরা বুঝতে পারি যে, চিত্রশিল্পীদের অভিশাপ দেয়ার বিষয়টি সূরা আরাফের ৩৩ নম্বর আয়াতে হারামের যে মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে তার সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ অশ্লীল বা মূর্তি পূজার উদ্দেশ্যে কেউ যদি কোনো ছবি আঁকে তাহলে সেটি অবশ্যই ইসলামে নিষিদ্ধ এবং এই ছবি অংকনকারী ইসলামের দৃষ্টিতে অবশ্যই অভিশপ্ত।

২. কাপড়ে বা অবমাননার স্থানে কোনো ছবি থাকলে সেগুলো নিষেধ নয়

আবু তালহা (রা) বর্ণনা করেন, নবী (স) বলেছেন, যে ঘরে কোনো ছবি থাকে, সেখানে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না। বুসর (রহ) বলেন, পরে একবার যায়েদ ইবনে খালিদ (রা) অসুস্থ হলে আমরা তাঁকে দেখতে গেলাম। সেখানে আমরা দেখলাম তাঁর ঘরে একটি পর্দা টাঙানো আছে, যাতে নকশা করা ছবি রয়েছে। আমি উবাইদুল্লাহ আল-খাওলানীকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কি আমাদেরকে ছবির হারাম হওয়া সম্পর্কে বলেননি? উবাইদুল্লাহ উত্তর দিলেন, তিনি তো এও বলেছিলেন যে, যদি তা কাপড়ের উপর নকশা আকারে হয় (তাহলে ব্যতিক্রম হতে পারে)। তুমি কি এটি শোননি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, অবশ্যই তিনি এই কথাগুলো বলেছিলেন! (সহিহ বুখারি: ৩২২৬)

আবু হুরায়রা (রা) নবী (স) থেকে মারফুভাবে বর্ণনা করেন, যে সব ছবি অপমানিত অবস্থায় পদদলিত হয় (যেমন কার্পেট, বালিশের নকশা ইত্যাদি), সেগুলোর ব্যাপারে তিনি অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু যে সব ছবি দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে, সেগুলো নাজায়েয। ((আল-দিরায়াহ ফি তাখরীজ হাদিস আল-হিদায়া: ২৩৮)

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি তার একটি পর্দা টাঙ্গিয়ে দিয়েছিলেন যাতে ছবি আঁকা ছিল। নবী (স) এটি দেখে তা ছিঁড়ে ফেললেন। এরপর আয়িশা (রা) ঐ কাপড় দিয়ে দুটি বালিশ বানালেন। সেই বালিশ দুটি ঘরেই রাখা হতো এবং নবী (স) সেগুলোর উপর বসতেন। ((সহিহ বুখারি নং ২৪৭৯)

এ সকল হাদিস থেকে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি ইসলামে ঢালাওভাবে সব ধরনের ছবি হারাম নয়। যদি তাই হতো তাহলে রাসুল (স) এই ছবিগুলোর ক্ষেত্রে অনুমতি দিতেন না। সুতরাং হারামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক ছবিকেই হাদিসে রাসূল (স) নিষেধ করেছেন।

৩. শির্কের সাথে সম্পৃক্ত ছবিকে রাসুল (স) হারাম করেছেন

আয়িশা (রা) বর্ণনা করেন,নবী (স) তাঁর ঘরে ক্রুশের নকশা যুক্ত কোনো বস্তু দেখলে তা অবশ্যই ভেঙে দিতেন। (সহিহ বুখারি: ৫৯৫২)

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, উম্মে হাবিবা (রা) ও উম্মে সালমা (রা) রাসূল (স)কে হাবশায় দেখা একটি গির্জার কথা বললেন, যেখানে ছবি ছিল। তখন রাসূল (স) বললেন, এরা (খ্রিস্টানরা) যখন কোনো নেক ব্যক্তিকে পেত, সে মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ বানিয়ে নিত এবং সেখানে এসব ছবি আঁকত। কিয়ামতের দিন এরা আল্লাহর নিকট সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টিতে পরিণত হবে। (সহিহ মুসলিম: ৫২৮)

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (স) যখন (মক্কা বিজয়ের সময়) কাবাঘরে ছবি দেখলেন, তখন তিনি সেখানে প্রবেশ করলেন না, যতক্ষণ না সেগুলো মুছে ফেলার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর সেগুলো মুছে ফেলা হলে তিনি প্রবেশ করলেন। (সহিহ বুখারি: ৩৩৫২)

সাফিয়্যা বিনতে শায়বা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (স) মক্কা বিজয়ের দিন যখন কিছুটা শান্ত হলেন, তখন তিনি একটি উটের পিঠে সওয়ার হয়ে নিজ হাতে থাকা লাঠি দিয়ে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন। অতঃপর তিনি কাবাঘরে প্রবেশ করলেন এবং সেখানে কাঠের তৈরি একটি কবুতর (মূর্তি) দেখতে পেয়ে তা ভেঙে ফেললেন। এরপর তিনি কাবার দরজায় দাঁড়িয়ে সেটি বাইরে ছুঁড়ে দিলেন। আমি তখন তাঁর এই সমস্ত কাজ নিজ চোখে দেখছিলাম। (ইবনে মাজাহ: ২৯৪৭)

ক্রুশের নকশা ভেঙে দেয়, গির্জার দেয়ালে অংকন করা ছবির নিন্দা করা এবং কাবা ঘর থেকে মূর্তি নিধন করা; এসকল হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে ছবি অথবা মূর্তি ইসলামে ঢালাওভাবে নিষেধ নয়। বরং যে সকল ছবি বা মূর্তি শিরকের সাথে সম্পৃক্ত ইসলামে সেগুলোকেই হারাম করা হয়েছে।

৪. আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণের নিষেধাজ্ঞা

আবু যুরআ (রহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা (রা)-এর সাথে মারওয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করলাম। সেখানে তিনি কিছু ছবি দেখে বললেন, আমি রাসূল (স)কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা বলেন, সেই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম আর কে হবে, যে আমার সৃষ্টির অনুকরণে সৃষ্টি করতে বের হয়? একটি কণাও সৃষ্টি করে দেখাক, অথবা একটি দানা কিংবা একটি যবের দানা সৃষ্টি করে দেখাক! (সহিহ মুসলিম: ২১১১)

এখানে সাধারণ মূর্তি বা ছবি নির্মাণ করার কথা বলা হয়নি। মূলত আরব মুশরিকদের ধারণা ছিল তারা যে মূর্তিগুলো নির্মাণ করে তা নির্জীব নয়। এগুলো পাথর বা কাঠ দিয়ে তৈরি হলেও এরমধ্যে প্রাণ রয়েছে। এ কারণেই হাদিসে তাদের এই ধারণাকে নিন্দা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, یخلق خلقا کخلقی” (আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করে)। বস্তুত এটি একটি শিরকি আকিদা, যা তৎকালীন আরবের মুশরিকরা পোষণ করত। এ কারণেই উক্ত হাদিসে তাদের নিন্দা করা হয়েছে।

৫. কিছু হাদিসে সরাসরি প্রাণীর ছবি নিষেধ করা হয়নি তবে রাসূল (স) ব্যক্তিগতভাবে সেগুলোকে পছন্দ করেননি। নিচে এ ধরনের কিছু হাদিস তুলে ধরা হলো:

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের একটি পর্দা ছিল, যাতে একটি পাখির ছবি আঁকা ছিল। বাড়িতে কেউ প্রবেশ করলে তার সামনে সেই ছবিটি দেখা যেত। রাসূল (স) আমাকে বললেন, এটি সরিয়ে দাও। কারণ আমি যখনই ঘরে প্রবেশ করি এবং এটি দেখি, তখন এটি আমাকে দুনিয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (সহিহ মুসলিম: ২১০৭)

ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (স) ফাতিমা (রা)-এর ঘরের দরজায় এসেছিলেন, কিন্তু ভিতরে প্রবেশ না করে ফিরে গেলেন। পরে আলী (রা) এসে ফাতিমা (রা)-কে এই ঘটনা জানালে, তিনি নবী (স)কে জিজ্ঞাসা করলেন,’আপনি ফাতিমার ঘরে প্রবেশ করলেন না কেন?’নবী (স) উত্তর দিলেন, আমি তার দরজায় নকশাকৃত একটি পর্দা দেখেছি। এরপর তিনি বললেন, ‘দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক?’আলী (রা) ফাতিমা (রা)-কে এই কথা জানালে তিনি বললেন, নবী (স) এ বিষয়ে যা নির্দেশ দেন, আমি তা মেনে নেব।’ তখন নবী (স) বললেন, ‘এটি অমুক পরিবারকে দিয়ে দাও, তাদের এটি প্রয়োজন।(সহিহ বুখারি: ২৬১৩)

হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের একটি পর্দা ছিল যাতে একটি পাখির ছবি আঁকা ছিল। ঘরে প্রবেশকারী যে কেউ প্রবেশ করলে তা তার সামনে দৃষ্টিগোচর হত। তখন রাসূল (স) আমাকে বললেন, এটি সরিয়ে দাও। কারণ আমি যখনই ঘরে প্রবেশ করে এটি দেখি, আমার মন দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে রাসূল (স) আমাদের এটি ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেননি। (সহিহ মুসলিম: ২১০৭)

এখানে স্পষ্ট যে, রাসুল (স) ছবি অংকন করাকে নিষেধ করেনি। কিন্তু তিনি তার ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে তার চোখের সামনে থেকে ছবিগুলোকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এবং কারণটিও তিনি উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ দুনিয়ার প্রতি ঝোঁক তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় তিনি এই ছবিগুলোকে নিজের চোখে সামনে থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এছাড়াও কয়েকটি হাদিস রয়েছে যেখানে ছবি এবং কুকুরের বিষয়ে বলা হয়েছে, ফেরেশতা ঐ ঘরে প্রবেশ করে না যেখানে কুকুর বা ছবি থাকে। এই হাদিসগুলো সম্পর্কে আমরা ইতোমধ্যেই ইসলামের দৃষ্টিতে কুকুর পালন শিরোনামের প্রবন্ধের মধ্যে আলোচনা করেছি। আগ্রহী পাঠকরা চাইলেই আমাদের ওয়েবসাইট থেকে প্রবন্ধটি পড়তে পারেন।

কিছু প্রশ্নের উত্তর

প্রাণীর ছবি অথবা ভাস্কর্য হারাম হওয়ার পক্ষে আমাদের আলেমরা বেশ কিছু যুক্তি প্রদান করে থাকেন। প্রথমত তারা বলেন পৃথিবীতে মূর্তির মাধ্যমেই শিরকের প্রচলন ঘটেছে। তাই সব ধরনের মূর্তি ইসলামে হারাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো মূর্তির মাধ্যমে পৃথিবীতে শিরক শুরু হয়নি। শিরক মূলত একটি আকিদা বা চিন্তাগত বিষয়। মূর্তি পূজা ছাড়াও কেউ অদৃশ্য কোনো সত্তাকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে শিরাকে লিপ্ত হতে পারে। তাই এই যুক্তি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় যে, মূর্তির মাধ্যমে পৃথিবীতে শিরকের প্রচলন ঘটেছে।

দ্বিতীয় যে যুক্তি প্রদান করা হয় তা হলো প্রাণীর ছবি বা মূর্তি নির্মাণ করা মূলত আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ করার শামিল। আর এ ধরনের কাজ ইসলামে হারাম। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ করা ইসলামে হারাম নয়। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি তৎকালীন আরবের লোকেরা মনে করত তারা যে পাথর বা কাঠ দিয়ে মূর্তিগুলো তৈরি করছে তা প্রাণহীন নয়।তারা অদৃশ্যভাবে এই মূর্তিগুলোর মধ্যে প্রাণ আছে বলে মনে করত। আর এভাবেই তারা একটি মূর্তিকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে উপাসনা করত। যেহেতু এটি একটি প্রকাশ্য শিরক ছিল তাই তাদের এ ধরনের কাজকে নিন্দা করা হয়েছে। মূলত পৃথিবীতে মানুষ যা কিছুই তৈরি করে তা কম বেশি আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণেই তৈরি করে। মানুষ আকাশে পাখি উড়তে দেখে প্লেন তৈরি করেছে। পানির গভীরে মাছের চলাচল দেখে সাবমেরিন তৈরি করেছে। ঠিক তেমনিভাবে মানুষ সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য প্রাণীর ছবি বা ভাস্কর্য নির্মাণ করে। আর অবশ্যই এ ধরনের কাজ ইসলামে নিষেধ নয়, যা ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি।

তৃতীয় যে যুক্তিটি দেয়া হয় তা হলো কুরআনের মধ্যে আল্লাহ হযরত সুলাইমান (আ)-এর দরবারে থাকা যে ভাস্কর্যের নীরব প্রশংসা করেছেন তা হযরত সুলাইমান (আ)-এর যুগের শরীয়তের বিধান ছিল, মুহাম্মদ (স)-এর যুগের নয়। তাদের এ যুক্তিটিও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ কোনো কিছু যদি পূর্ববর্তী নবীদের যুগে কল্যাণকর হয়ে থাকে তাহলে আমাদের জন্যও তা কল্যাণকর হবে। আর যদি কোনো কিছু পূর্ববর্তী নবীদের যুগে অকল্যাণকর হয়ে থাকে তাহলে সেটি আমাদের জন্যও অকল্যাণকর। তাই এ যুক্তি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় যে, সুলাইমান (আ)-এর যুগে আল্লাহ ভাস্কর্যের প্রশংসা করলেও মুহাম্মদ (স) যুগে ইসলামে ভাস্কর্য নিষিদ্ধ। কেননা ইতোমধ্যেই আমরা কুরআনের দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে দেখেছি হারামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হলে কোনো প্রাণীর ছবি অথবা ভাস্কর্য ইসলামে হারাম নয়।