হাদিস ও সুন্নাহকে সাধারণত সমার্থক পরিভাষা মনে করা হয়। তবে এই ধারণা সঠিক নয়, কারণ হাদিস ও সুন্নাহর মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে এবং ইসলামে হাদিস ও সুন্নাহর পৃথক মর্যাদা ও অবস্থান রয়েছে। হাদিস ও সুন্নাহ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করার জন্য সবার আগে এই দুটি পরিভাষার পার্থক্য বুঝতে হবে।
হাদিস:
হাদিস শব্দটি দ্বারা নবী (সা.)-এর উক্তি, কর্ম বা মৌন সম্মতিকে বোঝানো হয়, যা সত্য বা মিথ্যা উভয় সূত্রেই বর্ণিত হতে পারে। হাদিসশাস্ত্রের সমালোচক ও বিশেষজ্ঞগণ, যারা ‘মুহাদ্দিস’ নামে পরিচিত, মৌন সম্মতির ক্ষেত্রে ‘তাকরির’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ নবী (সা.)-এর উপস্থিতিতে কোনো মুসলিম এমন কোনো কাজ করেছেন, যা তিনি লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু আপত্তি বা নিন্দা করেননি। মুহাদ্দিসগণ হাদিসের জন্য ‘খবর’ নামক আরেকটি পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেন। হাদিসশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, একটি ‘খবর’ সত্য কিংবা বানোয়াট কাহিনী উভয়ই হতে পারে। তাই মুসলিম আলেমগণ মনে করেন হাদিস মূলত ‘যন্নী’ বা সম্ভাব্যরূপে সত্য। এ কারণেই নির্ভরযোগ্যতার বিচারে হাদিসের বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন: সহীহ, হাসান, যঈফ, মওযূ, মাকলূব ইত্যাদি। হাদিসের এই প্রতিটি বিভাগকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বিবেচনা করা হয় এবং এগুলোর গুরুত্বও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
খবরের প্রকারভেদ:
মুহাদ্দিসগণ হাদিস বা খবরকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন:
১. খবরে মুতাওয়াতির
২. খবরে ওয়াহিদ
১. খবরে মুতাওয়াতির:
আল-কিফায়াহ ফী ইলম আল-রিওয়ায়াহ’ গ্রন্থের লেখক, খতীব আল-বাগদাদী, ‘মুতাওয়াতির’ বর্ণনার সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে বলেন: মুতাওয়াতির হাদিস হলো বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত হওয়া হাদিস, যাকে বানোয়াট বর্ণনা হিসেবে প্রচার করা সম্ভব নয়। হাদিসশাস্ত্রে ‘খবরে মুতাওয়াতির’ শব্দটি প্রচলিত হলেও, এর দ্বারা যা বোঝানো হয়, তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। অনেক সময় একটি হাদিসকে ‘খবরে মশহুর’ বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু গবেষণা করলে দেখা যায় যে, এর সনদ বা বর্ণনাসূত্রের প্রথম তিন স্তরের প্রত্যেকটিতে কেবল একজন বর্ণনাকারীই রয়েছেন। এ ধরনের বর্ণনাগুলো তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরে পৌঁছানোর পরেই বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত হতে দেখা যায়। তাই আমি মনে করি যে হাদিসগুলোকে ‘খবরে মুতাওয়াতির’ হিসেবে গণ্য করা হয় তা যথার্থভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করার পর যদি কোনো হাদিস ‘খবরে মুতাওয়াতির’ হাওয়ার যোগ্যতা রাখে তবেই তাকে ‘খবরে মুতাওয়াতির’ বলা যেতে পারে, এছাড়া কোনো হাদিসকে ‘খবরে মুতাওয়াতির’ বলা যাবে না। উল্লেখ্য যে, আমার মতে কেবল সুন্নাহ-ই হলো মুতাওয়াতির। সুন্নাহর মুতাওয়াতির হওয়া হাদিসের মতো মৌখিক বর্ণনার উপর নির্ভরশীল নয়। সুন্নাহ হলো সেই মুতাওয়াতির আমল যা মুসলিমদের প্রতিটি প্রজন্ম নিজেদের কর্মের মাধ্যমে অবিচ্ছিন্নভাবে পালন করে এসেছে।
২. খবরে ওয়াহিদ
খবরে ওয়াহিদ বলতে সেই হাদিসকে বোঝায় যে হাদিস নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে না। যদিও একাধিক বর্ণনাকারীর সূত্রে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তবু তা নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে না। হাদিস সাহিত্যের বেশিরভাগই খবরে ওয়াহিদ বা একক বিচ্ছিন্ন বর্ণনা।
প্রামাণ্যতা অনুসারে হাদিসের শ্রেণীবিভাগ
ইমাম খতীব বাগদাদী প্রামাণ্যতা অনুসারে হাদিসকে মোট তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন।
১. খাঁটি বা গ্রহণযোগ্য হাদিস
২. বানোয়াট হাদিস
৩. অস্পষ্ট হাদিস
নিচে এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো:
১. খাঁটি বা গ্রহণযোগ্য হাদিস
ইমাম খতীব বাগদাদীর মতে এই হাদিস প্রথম শ্রেণীর হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এই হাদিসগুলো মানুষের বিবেক বুদ্ধি এবং সাধারন জ্ঞানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এছাড়ও এই হাদিসের সাথে কুরআন ও সুন্নাহর কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই। সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এই হাদিসগুলোকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, এখানে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ তাদেরকে বোঝানো হয়েছে যারা ধর্মীয় বিদআত এবং অন্ধ অনুকরণের দূষণ থেকে পবিত্র।
হযরত সাওবান (রা.) বর্ণনা করেন যে, নবী (সাঃ) বলেছেন:
আমার উম্মাহর একটি দল সর্বদা সত্যের উপর অবিচল থাকবে। কিছু লোক তাদের পরিত্যাগ করলেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তারা এই (অবিচল) অবস্থাতেই থাকবে যতক্ষণ না আল্লাহর নির্দেশ আসে। (মুসলিম শরিফ)
২. বানোয়াট হাদিস
ইমাম খতীব বাগদাদীর মতে যে হাদিস বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী এবং কুরআন-সুন্নাহর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক সেই হাদিসই বানোয়াট হাদিস। খবরে ওয়াহিদ বর্ণিত জ্ঞানের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা প্রদানে ব্যর্থ, তাই সেগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই হানাফী ফকীহদের মতে, ‘উমুমুল বালওয়া’-এর ক্ষেত্রে একক বর্ণনাগুলোর কোনো গুরুত্ব নেই। এই ধরনের বিষয়ে তারা কিয়াস এবং ইজতিহাদকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
৩. অস্পষ্ট হাদিস
যে হাদিসগুলো পরস্পর বিরোধী বর্ণনা প্রদান করে সেগুলোকে অস্পষ্ট হাদিস বলা হয়। এ ধরনের হাদিসের ক্ষেত্রে কেবল সেই হাদিসকেই গ্রহণ করা উচিত যেই হাদিসের পাঠ্য কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
সুন্নাহ:
আভিধানিকভাবে সুন্নাহ শব্দের অর্থ হলো সুস্পষ্ট, বহুল ব্যবহৃত, সমতল রাস্তা। কুরআনে সুন্নাহ শব্দটি আল্লাহ বিভিন্ন জাতির সাথে তাঁরকৃত আচরণ বোঝাতে ব্যবহার করেছেন।
আল্লাহ বলেছেন,
পূর্বে যে নবীগণ গত হয়েছেন তাদের বেলায়ও আল্লাহর একই নীতি ছিল। আল্লাহর আদেশ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে। (সূরা আহযাব: ৩৮)
অতএব এখন তারা শুধু আল্লাহর সেই চিরন্তন নীতি প্রকাশিত হওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছে যা পূর্ববর্তীদের বেলায় প্রকাশিত হয়েছিল। (তা-ই যদি হয়) তাহলে আল্লাহর এই চিরন্তন নীতির মধ্যে আপনি কখনোই কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন না এবং আল্লাহর এই চিরন্তন নীতির ব্যত্যয় ঘটতেও আপনি কখনো দেখবেন না। (সূরা ফাতির: ৪৩)
মূলত সুন্নাহ হলো সেই আমল যা নবী (সা.) শরীয়তের শিক্ষক এবং সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে শিক্ষা দিয়েছেন এবং কার্যত প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর এই সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করা নবী (সা.)-এর জন্য একটি অপরিহার্য দায়িত্ব ছিল।
কুরআনে বলা হয়েছে,
বাস্তবতা হচ্ছে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসুলের আভির্ভাব ঘটিয়েছেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান, তাদের পরিশুদ্ধি করেন এবং (এ উদ্দেশ্যে) তাদেরকে বিধান ও হিকমত শিক্ষা দেন। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইতিপূর্বে তারা সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিল। (সূরা আল ইমরান: ১৬৪)
(হে মানুষেরা, সে সময়) আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য (অবিচলতার) এক উত্তম নজির ছিল; যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অনেক বেশি স্মরণ করে, তাদের জন্য। (সূরা আহযাব: ২১)
নবী (সা.) আমাদের জন্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোত্তম আদর্শ স্থাপন করেছেন। তিনি আমাদের কেবল ধর্মীয় নির্দেশা এবং শিষ্টাচার শেখাননি, বরং কীভাবে সেগুলো অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করতে হয় তাও ব্যবহারিকভাবে দেখিয়েছেন। সুন্নাহ অস্বীকারকারীরা মনে করে যে, নবী (সা.) একজন সাধারণ বার্তাবাহক ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। নবী (সা.)-কে কেবল আল্লাহর কিতাব পৌঁছে দেওয়ার জন্যই পৃথিবীতে পাঠানো হয়নি, বরং মানুষকে পরিশুদ্ধ করতে এবং শরীয়ত কীভাবে অনুশীলন করতে হয় তা শেখানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি মুমিনদের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তি। কেবল তাকে অনুসরণ করেই আমরা আমাদের জীবনকে ইসলাম এবং ঈমানের নির্দেশাবলী অনুসারে গঠন করতে পারি।
সুন্নাহর গুরুত্ব
কুরআনের বিধানগুলো নির্দেশ আকারে দেয়া হয়েছে, এই বিধান কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে তা বলা হয়নি। এর আমল বা প্রয়োগ নবী (সা.)-এর ব্যাখ্যার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামের সমগ্র কাঠামো নবী (সা.) এর সুন্নাহর ভিত্তির উপর নির্মিত। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন কেবল নামায, রোযা, হজ, যাকাত এবং অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কিত মৌলিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে । তবে, এই নির্দেশাবলী কিতাবে বাস্তবায়ন করতে হবে তা বলা হয়নি। এমনকি নামাযের সময় এবং রাকাত সংখ্যা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বিবরণও কুরআনে নেই। অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। যেমন একজন চোরের হাত কাটার নির্দেশ কুরআনে পাওয়া যায়। কিন্তু কুরআনে এ কথা বলা হয়নি চুরি করা বস্তুর কতটুকু মূল্য হলে এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে, হাত কোথা থেকে কাটা হবে। এই ধরনের প্রশ্নগুলো নবী (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত বাণী এবং তাঁর অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যদি আমরা সুন্নাহকে একপাশে সরিয়ে রাখি, তবে আমাদের কাছে কেবল কুরআনের মূল নির্দেশনাগুলোই থাকবে এবং আমরা সেগুলো কীভাবে অনুশীলন করতে হবে সে সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাব। যেমনটি ইব্রাহিমের ধর্মের অনুসারী, তথাকথিত ‘হানিফদের সাথে ঘটেছিল। কথিত আছে যে, তারা কাবার দেয়ালের পাশে বসে আল্লাহকে বলত: “হে প্রভু, আমরা জানি না কীভাবে আপনার ইবাদত করতে হয়। যদি আমরা জানতাম, তবে আমরা নির্ধারিত উপায়ে আপনার ইবাদত করতাম। কুরআনের এই বিধানগুলোর যথার্থ ব্যাখ্যা কেবল সুন্নাতের মাধ্যমে করা সম্ভব এবং সুন্নাতের মাধ্যমেই কুরআনের এই বিধানগুলো পূর্ণাঙ্গতা পায়।
ঠিক এই কারণেই নবী (সাঃ) বলেছেন,
সাবধান, আমাকে কুরআন এবং এর সাথে এর মতো আরও কিছু দেওয়া হয়েছে। (আবু দাউদ, নং: ৪৬০৪)
অর্থাৎ কুরআনের মতোই সুন্নাহও আমাদের অপরিহার্যভাবে মেনে চলতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ কুরআনকে স্পষ্ট করার জন্য নবী (সা)-কে পাঠিয়েছেন। তিনি কুরআনের শিক্ষার সর্বোত্তম আদর্শ স্থাপনকারী এক অনুকরণীয় উদাহরণ। তিনি এই কাজটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেছেন। সুতরাং কুরআনের সাথে সুন্নাহর সম্পর্ক ঠিক তেমন যেমন আত্মার সাথে দেহের সম্পর্ক। কুরআনের শিক্ষা হলো আত্মা, যার পর্যবেক্ষণযোগ্য রূপ হলো সুন্নাহ। উভয় মিলেই ইসলাম গঠিত। এর কোনো একটির অনুপস্থিতি ইসলামকে বিকৃত করে দিবে এবং ইসলামের কাঠামোকে ধসিয়ে দিবে।
কুরআন ও সুন্নাহর পারস্পরিক সম্পর্ক
কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের গভীরতা এতটাই বিস্তৃত যে, সামান্য আলোচনায় তা শেষ করা যাবে না। কুরআন ও সুন্নাহর সম্পর্ক রেকর্ড করতে গেলে পুরো একটি লাইব্রেরি প্রয়োজন। যাইহোক, যেহেতু সুন্নাহ মৌখিক বা গ্রন্থগত কোনো বিদ্যা নয়, তাই নবী (সা.) সুন্নাতের আমল ব্যবহারিকভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। নবী (সা.)-এর ওফাতের পর, এই দায়িত্ব তাঁর সাহাবীদের (রা.) উপর এসে পড়েছিল। পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহর ধার্মিক ও পরহেজগার ব্যক্তিরা, যারা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী, এই দায়িত্ব পালন করেছেন। যারা আল্লাহর ধর্মের জন্য কাজ করতে এগিয়ে আসে, তাদের জন্য অপরিহার্য যে, তারা নিজেরা সতর্কতার সাথে সুন্নাহ পালন করবেন, এমনকি সেইসব বিষয়ও যা আপাতদৃষ্টিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং সাধারণ মানুষকে সেগুলো মেনে চলার শিক্ষা দিবেন।
সুন্নাহর প্রকৃতি এবং পরিধি
সুন্নাহ কেবল মানব জীবনের ব্যবহারিক দিকগুলোর সাথে সম্পর্কিত। এটি কেবল ধর্মীয় অনুশীলনগুলোর সাথে সম্পর্কিত। মুসলিমদের বিশ্বাস, ইতিহাস এবং কুরআনের আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপটের সাথে সুন্নাহর সম্পর্ক নেই।
সুন্নাহ হাদিসের উপর নির্ভরশীল নয়
সুন্নাহ হাদিসের উপর নির্ভরশীল নয়। হাদিস মূলত সত্য বা মিথ্যা উভয় সূত্রেই বর্ণিত হতে পারে। কিন্তু সুন্নাহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। নবী (সা) থেকে আমাদের পর্যন্ত সমস্ত মুসলিম প্রজন্ম কোনো বিরতি ছাড়াই এটি অনুসরণ করেছে। যেভাবে পবিত্র কুরআন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মৌখিক বর্ণনার (তাওয়াতুরে কওলী) মাধ্যমে প্রথমে নবী (সা.) থেকে তাঁর সাহাবীদের (রা.) প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছে, যারা এটিকে ঐকমত্যের সাথে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিয়েছেন। মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি প্রজন্ম কুরআনের এই অবিচ্ছিন্ন স্থানান্তরের প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে যতক্ষণ না এটি আমাদের কাছে পৌঁছেছে। ঠিক একইভাবে সুন্নাহও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রতিটি স্তরে ব্যবহারিক আনুগত্যের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে। হাদিসের মধ্যে ইবাদতের যে বর্ণনাগুলো পাওয়া যায় তা মূলত সুন্নাহর পক্ষে একটি গ্রন্থগত সমর্থন যোগায়। এ কারণেই সুন্নাতের আমলের সাথে কোন হাদিস যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তখন সেই হাদিসকে গ্রহণযোগ্য হাদিস বলা হয়।আর যদি সুন্নাতের আমলের সাথে কোন হাদিস সাংঘর্ষিক হয় তবে তা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে হাদিসকে অগ্রহণযোগ্য বলার আগে একজন হাদিস বিশারদের কর্তব্য হলো ভালোভাবে সেই হাদিসকে পর্যালোচনা করা এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করা কুরআন ও সুন্নাহর সাথে হাদিসকে মিলিয়ে দেখার।
এ কারণেই ইমাম মালিক মদিনার অধিবাসীদের ব্যবহারিক আমলকে সর্বদা হাদিসের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম মালিক মনে করতেন মদিনার অধিবাসীদের আমলের সত্যতা হাদিসের থেকেও বেশি নির্ভরযোগ্য।ইমাম আবু হানিফার অনুসারীরাও এই ভিত্তিতেই হাদিসকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি।
নবী (সাঃ) বলেছেন:
তোমাদের উপর আমার অনুশীলন এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের অনুশীলন অনুসরণ করা অপরিহার্য। (ইবনে মাজাহ, নং: ৪২)
নবী (সা.) এর সাহাবীরা (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম প্রাপক এবং ইসলাম অনুশীলনকারী প্রথম ব্যক্তি। তারা নবী (সা.)-এর নিকট থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তা বিশ্বে পৌঁছে দিয়েছেন। একারণেই তাদের অনুশীলন নবী (সা.) এর উপর ভিত্তি করে গৃহীত এবং স্বীকৃত। বর্তমান সময়ে, যারা ইসলামের নামে নতুন অনুশীলন উদ্ভাবন করে এবং সেগুলোকে ধর্মীয় আচার হিসেবে পালন করে, তারা হলো বিদআতী। নবী (সা.) ইসলামের নামে প্রবর্তিত মিথ্যা, বানোয়াট এবং বিদআতকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া পথভ্রষ্টতা হিসেবে নিন্দা করেছেন।
সুন্নাহ অস্বীকারকারীদের (মুনকিরীনে সুন্নাহ) প্রতি একটি প্রশ্ন
সম্প্রতি একদল লোকের আবির্ভাব হয়েছে যারা কুরআনের কর্তৃত্ব স্বীকার করে, কিন্তু সুন্নাহর কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর পেছনের যুক্তি বোধগম্য নয়। কুরআন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মৌখিক বর্ণনা (তাওয়াতুরে কওলী) দ্বারা আমাদের কাছে পৌঁছেছে। একইভাবে সুন্নাহও নবী (সা) থেকে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ব্যবহারিক আনুগত্য এবং অবিচ্ছিন্ন অনুশীলনের (তাওয়াতুরে ‘আমালী) মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহ একই প্রক্রিয়ায় আমাদের কাছে পৌঁছেছে, সুতরাং যারা সুন্নাহ অস্বীকার করে তাদের কাছে কুরআনকে সত্য হিসেবে স্বীকার করার কোনো প্রমাণ বা যুক্তি থাকে না। কারণ ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতা এবং নবী (সা.) থেকে আমাদের কাছে স্থানান্তরের বাহনের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যেহেতু অধিকাংশ মুসলমান হাদিস ও সুন্নাতের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করতে পারেনা, তাই হাদিসের ভুল বর্ণনা গুলোকে তারা সুন্নাহ মনে করে এবং হাদিসের পাশাপাশি সুন্নাহকেও তারা প্রত্যাখ্যান করে।
সুন্নাহ অস্বীকারকারীদের জ্ঞানতত্ত্বিক আন্দোলনের ইতিহাস যারা জানেন তারা এ বিষয়ে দ্বিমত করতে পারবেন না যে, সুন্নাহ অস্বীকার করার প্রবণতা মূলত হাদিসের কিছু ভুল ব্যাখ্যার ওপর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে মুসলিম আলেমগণ এই প্রশ্নকারীদের উপর ক্ষুব্ধ হন এবং এই বিতর্কের মায়াজালে জড়িয়ে হাদিস ও সুন্নাতের মধ্যকার প্রকৃত পার্থক্য ভুলে যান। হাদিসের উপর আক্রমণকারীরাও উপলব্ধি করতে পারেনি যে, তারা হাদিসের সমালোচনা করতে গিয়ে সুন্নাহকে অস্বীকার করছে। একইভাবে হাদিস রক্ষাকারী আলেমরাও হাদিসকে রক্ষা করতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছেন যে, হাদিস আর সুন্নাহ এক নয়। উপরন্তু একটি অহেতুক বিতর্কে উভয়পক্ষ নিজেদের সমস্ত শক্তি এবং সময় ব্যয় করেছেন। ফলে একদল ইসলামের মূল ভিত্তিকে অস্বীকার করে বসলো এবং অন্য দল সুন্নাতের কাঠামোকে দুর্বল করে তুলল।
একই আমলের বিভিন্ন আদর্শ রূপ
অনেকেই এটি মেনে নিতে চায় না যে, ইসলামের একটি আমলের একাধিক বৈধ পদ্ধতি থাকতে পারে। ইসলামের এই আমলগত বৈচিত্র অনুধাবন করতে না পারার কারণেই মুসলিমরা আজ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে একে অপরকে ভ্রান্ত ও বধভ্রষ্ট মনে করছে। এক্ষেত্রে আমাদের বুঝতে হবে রাসুল (সা.) একটি বিষয়ে বিভিন্ন সুন্নাহ প্রবর্তন করতে পারতেন।
একটি হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, বিদায় হজের সময় রাসুল (সা.) একটি আসনে বসেছিলেন এবং বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদলকে গ্রহণ করেছিলেন। লোকেরা তাঁর কাছে এসে হজের আচার-অনুষ্ঠান সম্পাদনের বিষয়ে নির্দেশনা চেয়েছিল। একজন বলল, অমুক ব্যক্তি নির্দিষ্ট হজের আমলকে একটি নির্দিষ্ট উপায়ে সম্পাদন করেছে। নবী (সা.) তাকে বললেন, এতে কোনো ভুল বা সমস্যা নেই । আরেকজন ব্যক্তি সেই একই অনুষ্ঠান সম্পাদনের তার পদ্ধতির অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, নবী (সা.) তাকে বললেন, তার পদ্ধতিও সঠিক এবং বৈধ। সে কোনো পাপ করেনি। লোকেরা তাঁর কাছে ভিড় করে আসতে থাকে এবং নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের উপায় সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত চাইতে থাকে। নবী (সা.) সকলের অনুশীলনকে অনুমোদন করেছেন এবং যতদূর আমি জানি, কোনো হজযাত্রীর দ্বারা বর্ণিত কোনো কাজকে প্রত্যাখ্যান করেননি। এটি দেখায় যে, এই সমস্ত হজযাত্রীরা হজের আচার-অনুষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে পালন করেছিল। তবুও নবী (সা.) তাদের হজকে অনুমোদন করেছেন। তাদের কাজগুলো গ্রহণযোগ্য সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মানে হলো, একটি আমলের বিভিন্ন রূপ থাকতে পারে, যদি সেই আচার বা অনুশীলনের মূলভাব বজায় রাখা হয়। একে বিচ্যুতি বলা যায় না।
আমরা জানি যে, হাদিসে তাশাহ-হুদ (নামাযের শেষ অংশে বসে নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করা) সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। এই বিষয়ে সমস্ত হাদিস আইনগত বিষয়ে অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মহান সাহাবীদের (রা.) প্রতি সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে। এই হাদিসগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই তাশাহ-হুদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দোয়া বর্ণিত হয়েছে। তবুও, সকলের সারমর্ম এবং মূলভাব একই। ধরা যাক, কেউ উমর (রা.) বা ইবনে উমর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত দোয়া গ্রহণ করে এবং আয়েশা (রা.) এর বর্ণিত দোয়া পাঠ না করে। তাহলে কি বলা সমীচীন হবে সে সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত হয়েছে? অবশ্যই না, নিঃসন্দেহে কেউ এই হাদিসগুলোর কোনোটির প্রামাণ্যতা নিয়ে তর্ক করতে পারে এবং কেউ বৈধভাবে ঘোষণা করতে পারে যে এই বর্ণনাটি ঐটির চেয়ে বেশি প্রামাণিক। তবে, কেউ এই দোয়াগুলোর কোনোটিকে সুন্নাহ থেকে বিচ্যুতি বলে ঘোষণা করতে পারে না।
আমি মনে করি, সূরা ফাতিহা পাঠ করার পর অথবা নামাযে ইমামের সূরা শেষ করার পর উচ্চস্বরে ‘আমীন’ বলার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নামাযে বুকে হাত বাঁধা বা হাত ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টিও একই রকম। আমি এগুলোকে গ্রহণযোগ্য সুন্নাহর তালিকা থেকে বাদ দিতে পারি না। বড়জর এতটুকু বলা যেতে পারে যে, এই আমলটি ওই আমলের থেকে বেশি নির্ভরযোগ্য। কিন্তু আমলের এই বৈচিত্র অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের অধিকার নেই যে, এই বৈচিত্র্যের কারণে আমরা কাউকে সুন্নাতের আমল থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছে এই কথা বলতে পারি।